বাবুল কান্তি দাশ
‘কপাল’ নিয়ে মানুষের গবেষণার অন্ত নেই। প্রতিনিয়ত উপস্থাপিত একটি শব্দ কপাল। মানুষের জীবনে ‘কপাল’ শব্দটি যেন এক রহস্যময় প্রতীক। কেউ সাফল্য পেলে বলে- ‘তার কপাল ভালো’, আবার কেউ ব্যর্থ হলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে- “আমার কপাল খারাপ।” কিন্তু কপাল কি সত্যিই কোনো অদৃশ্য ভাগ্যের লিপি, না কি মানুষের নিজের কর্মের প্রতিচ্ছবি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াই দিবানিশি। এর যুগান্তকারী এক উত্তর দিয়েছেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র, যিনি ভাগ্যকে কোনো অলৌকিক কল্পনা নয়, বরং জীবনযাত্রার বিজ্ঞান বলে ব্যাখ্যা করেছেন। একদিন এক ভক্ত ঠাকুরের কাছে বলেছিলেন, “আমি তো করতেই চাই, কিন্তু আমার কপালে একটু ওলটপালট হয়ে যায়।” এই কথায় শ্রীশ্রীঠাকুর বিরক্ত হয়ে বললেনÑ “ঐ কথা শুনে আমার ভালো লাগে না। এতকাল বুঝলি কী? কপাল মানে কর্মফল। ‘ক’ মানে জল, মাথার ঘিলু; আর ‘পাল’ মানে যে তা পালন করে, অর্থাৎ মাথার খুলি। তাই কপাল মানে মাথা। যার মস্তিষ্ক যেমনতর বিন্যস্ত হয়, ও কাজকর্ম যে যেমনভাবে পরিচালনা করে, তাই তার কপাল।” এই ব্যাখ্যার মধ্যে ঠাকুর এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করেছেন-কপাল মানে ভাগ্য নয়, কপাল মানে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা; আর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নির্ভর করে কর্ম, চিন্তা ও নৈতিকতার ওপর। উপমা দিয়ে বলা যায়-মানুষের মস্তিষ্ক একখানি বীজের মতো, আর তার কর্ম সেই বীজকে ফলবান করে তোলার মাটি ও জল। যদি বীজ সুস্থ হয়, মাটি উর্বর হয়, আর জল সঠিক পরিমাণে পাওয়া যায়, তবে সেই গাছ যেমন ফলদায়ক হয়, তেমনি মানুষের জীবনও শুভফল দেয়। কিন্তু যদি চিন্তা-চেতনা (অর্থাৎ ঘিলু) বিকৃত হয়, কর্মবীজ দুর্বল হয়, তবে কপালের ফলও তেমনই নিষ্ফল হয়ে পড়ে। শ্রীশ্রীঠাকুরের দৃষ্টিতে কপাল হলো এক দর্পণ, যেখানে আমাদের চিন্তা, আচরণ ও কর্মফল প্রতিফলিত হয়। যেমন কেউ আয়নায় নিজের মুখের দোষ ঢাকতে পারে না, তেমনি জীবনের ভুল কাজ, কুমন্ত্রণা বা অলসতা থেকেও কেউ নিজের কপালকে উজ্জ্বল করতে পারে না। ঠাকুর কপালকে ব্যাখ্যা করেছেন এক জীবন্ত যন্ত্র হিসেবে, যেখানে চিন্তা হলো তার স্রোত, আর কর্ম হলো তার গতি। নদীর স্রোত যেমন দিক পরিবর্তন করে তার তীরভ‚মি গড়ে তোলে বা ভেঙে ফেলে, তেমনি মানুষের চিন্তা ও কর্ম তার ভাগ্যের গঠন ও বিনাশ ঘটায়। অতএব, “কপাল খারাপ” বলার মানে দাঁড়ায়-আমার চিন্তা ও কর্মের দিক ভুল হয়েছে। আর “কপাল ভালো” মানে-আমার চিন্তা সৎ, কর্ম সংযত, আর ইষ্টনিষ্ঠ জীবনে আমি স্থির। যেমন কৃষক নিজের জমিতে যত্ন নিয়ে চাষ করে যার প্রেক্ষিতে কৃষক সুফল ঘরে তোলে পরম আনন্দে এবং তৃপ্তিতে, তেমনি মানুষকেও নিজের কপালের জমিতে কর্মের বীজ বপন করতে হয়। পরিশ্রম, সততা ও আদর্শানুগ জীবন চলনা হলো সেই বীজের সার। যদি এই তিনটি মিলে যায়, তবে কপালের ফসল অবশ্যই সোনালী হবে। কপাল কোনো ভাগ্যের অক্ষর নয়, বরং কর্মের প্রতিফলন। মস্তিষ্কের চিন্তা, বুদ্ধি ও কর্মই কপালের রূপ নির্ধারণ করে। “নিজের কপাল নিজের হাতেই গড়া যায়; চিন্তার দিশা বদলালে, আদর্শানুগ জীবন চলনায় প্রবৃত্ত হলে ভাগ্যের রেখাও বদলে যায়।”
লেখক : প্রাবন্ধিক










