মনিরুল ইসলাম মুন্না
নভেম্বর শেষ হয়েছে কয়েক দিন হলো। কিন্তু প্রতীক্ষিত টাকার দেখা এখনও পাচ্ছেন না একীভ‚ত হওয়া ৫টি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আশ^াস দিয়েছিলেন, নভেম্বরের শেষের দিকে গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারবেন। কিন্তু নভেম্বর শেষ হওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। এতে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বলছেন, গভর্নর কথা রাখেননি।
গতকাল মঙ্গলবার নগরীর নিউ মার্কেট, চকবাজার, বহদ্দারহাট ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকার শাখাগুলো ঘুরে এ দৃশ্য দেখা গেছে।
সকালে কেউ, বিকেলে কেউ আবার ব্যাংকের শাখায় ছুটে যাচ্ছেন- হয়তো আজ হাতে কিছু দেওয়া হবে এই ক্ষীণ আশায়। কিন্তু প্রতিদিনই একই ফলাফল নিয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের। বন্ধ কাউন্টার, খালি লবি আর ব্যাংকারদের নিরুপায় মুখ, সব মিলিয়ে হতাশাই যেন এখন ব্যাংকিং হলের সবচেয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম কাগজে-কলমে শুরু হলেও একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের শাখাগুলোতে এখন গ্রাহকের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। যে শাখাগুলো মাত্র কয়েক মাস আগেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে গমগম করত, আজ সেখানে ঠাঁই নিয়েছে শূন্যতা। ডিপিএস বা জরুরি কোনো কাজে দু-একজন গ্রাহক এলেও প্রতিশ্রæত টাকা উত্তোলনের সুযোগ কার্যত বন্ধ। হতাশা আর অস্বস্তির কারণে গ্রাহকেরা ইচ্ছা করেই কম আসছেন বলে জানালেন একাধিক কর্মকর্তা।
আন্দরকিল্লার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখায় দুপুরের দিকে গেলে দেখা যায় পুরো লবি ফাঁকা। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর প্রথম গ্রাহকের দেখা মেলে। তিনি এসেছেন মাসিক ডিপিএস জমা দিতে। এরপর আরও এক গ্রাহক এলেন একই কাজে।
জমানো টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুল হক চৌধুরী নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘আমার পাঁচ বছর মেয়াদি ডিপিএস আছে। জমা দিতে এসেছি। অনেকে টাকা তুলে নিচ্ছে শুনেছি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সরকার টাকা ফেরত দেবে। এখন ডিপিএস ভাঙলে ব্যাংকের ঘোষিত কোনো সুবিধাই পাব না, মুনাফাও যাবে। তাই নিয়মিতই জমা দিচ্ছি।’
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কালামিয়া বাজার শাখায়ও একই চিত্র। কর্তারা নিজেদের কাজে ব্যস্ত, গ্রাহক নেই। আগ্রাবাদের এক্সিম ব্যাংকের শাখায় গিয়েও দেখা গেছে আগের মতো ভিড় নেই। সরকার পরিবর্তনের আগে যে শাখাটিতে প্রতিদিন শত শত গ্রাহক ভিড় জমাতেন, এখন সেটিতেও নেমে এসেছে নীরবতা।
উত্তোলন বা আমানত ফেরত দেওয়ার বিষয়ে শাখার কর্মকর্তারা কথা বলতে নারাজ। ওপর মহলের নিষেধাজ্ঞার কথা ইঙ্গিত করেই নীরব থাকছেন তারা।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনাই তাদের সবচেয়ে বড় কাজ।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, সরকারি মালিকানায় একটি ইসলামী ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করেছে- এটা দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তবে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে দাঁড় করাতে কারিগরি টিম কাজ করছে। পাঁচ ব্যাংককে আইনসম্মতভাবে একীভ‚ত করা এবং নীতিমালা নতুন করে সাজানোই এখন মূল লক্ষ্য। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
কাগজে-কলমে অগ্রগতি দ্রুত হলেও সাধারণ গ্রাহকের দৃষ্টিতে বাস্তবতা এখনও অপরিবর্তিত। বহু মানুষের মেয়ের বিয়ের খরচ, চিকিৎসার টাকা, ব্যবসার টাকাসহ জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজনই আটকে রয়েছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
এক আমানতকারীর কথায়, ‘প্রতিদিন এসে খালি হাতে ফিরি। গভর্নর বলেছেন টাকা পাবো, কিন্তু কবে পাবো সেটা কেউ বলতে পারে না।’
নভেম্বরের প্রতিশ্রুতি পেছনে ফেলে ডিসেম্বরও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু গ্রাহকদের মনে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটি সেই এক- জমানো টাকা ফেরার দিনটা আদৌ কি সামনে? নাকি অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হবে?
প্রসঙ্গত, গত ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে গড়ে তোলা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একই দিনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে ছাড় দিয়েছে, যা ব্যাংকের হিসাবে জমাও হয়েছে। নতুন ব্যাংকটির মোট পেইড-আপ ক্যাপিটাল হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানতকারীদের শেয়ার থেকে আসছে আরও ১৫ হাজার কোটি।










