
এমরান চৌধুরী
ভদ্রলোক হাতের কাছে যে বই পেতেন সেটাই পড়া শুরু করতেন। বই পাঠে এমনই মগ্ন হতেন যে ভুলে যেতেন নাওয়া-খাওয়া। কখনো কখনো গাছের নিচে ছায়ায় বসে একনাগাড়ে ডুবে থাকতেন বই নিয়ে। পড়তে পড়তে অনেক সময় কখন যে সেখানে ঘুমিয়ে পড়েছেন টেরই পেতেন না। এমনকি বই পড়ছেন আর হাঁটছেন এভাবে আনমনে পাহাড়ে বা জঙ্গলেও চলে যেতেন। এমন বইপাগল, বইপ্রেমি মানুষটা কে? জানতে যে কারো ইচ্ছে জাগতে পারে! তিনি একজন জ্ঞানপিপাসু মানুষ। বই পড়ে সেই পিপাসা মিটাতে কী রাত কী দিন পড়ে থাকতেন বই নিয়ে। এই জ্ঞানপিপাসু মানুষটি ছিলেন বহুগুণের আধার এবং সর্বোপরি একজন কবি। অন্য অভীধায় তিনি যতটা পরিচিত ছিলেন, তারচেয়ে বেশি খ্যাতি ছিল তাঁর কবি হিসেবে, শুধু তাঁর দেশে নয়- নিখিল বিশ্বে। বই পাঠে মানুষের ভেতর অনুপ্রেরণা সৃজন তথা বইপড়ার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি লিখেছেন, ‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’
এই বইপ্রেমি মানুষটি হলেন সোনালী দিনের আরেক সোনার মানুষ ওমর খৈয়াম। কবি ওমর খৈয়াম। একইসাথে তিনি একজন দার্শনিক, গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ ছিলেন। গণিত মানে এমন একটি বিষয় তাতে না আছে রস, না আছে কষ। এমন রসকষহীন গণিত নিয়ে যিনি কাজ করতেন তিনিই আবার লিখতেন অমৃত বচন। কবিতার যতো মধুর পঙক্তিমালা। তাঁর কালজয়ী কাব্যগ্রন্থের নাম ‘রুবাইয়াত’।
রুবাইয়াত শব্দটি ফারসি শব্দ ‘রুবাই’ থেকে এসেছে। যার অর্থ চার লাইনের কবিতা বা স্তবক। এটি ফারসি সাহিত্যে একটি বিশেষ কাব্যরূপের নাম, যা চার লাইনের স্তবকে গঠিত। এই ধরনের কবিতায় সাধারণত প্রেম, প্রকৃতি, আনন্দ-বেদনা এবং আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি বিষয় ফুটে ওঠে। ১৮৫৯ খ্রীস্টাব্দে তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ ‘রুবাইয়াত অব ওমর’ প্রকাশিত হয়। বৃটিশ কবি এডওয়ার্ড ফিটজারেল্ড খৈয়ামের ১১০ টি রুবাইয়াত অনুবাদ করে সমগ্র বিশ্বের সাহিত্য জগৎ এ এক আলোড়নের সৃষ্টি করেন। উল্লেখ্য যে, ফিটজেরাল্ডের অনুবাদের পরেই ওমর খৈয়ামের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং কবিতাগুলো পশ্চিমা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয় ওঠে। এমনকি তাঁর নিজ দেশের চেয়েও বেশি! আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে তিনি ওমর খৈয়ামের রুবাইগুলোর বাংলা অনুবাদ করেছেন।
ওমর খৈয়াম ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মে পারস্যের (বর্তমান ইরান) খোরাসান প্রদেশের বিখ্যাত বাণিজ্যিক শহর নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম গিয়াসউদিন আবুল ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম নিশাপুরি। তাঁর পিতার নাম ছিল ইব্রাহীম। তিনি ছিলেন একজন খৈয়াম অর্থাৎ তাবু প্রস্তুতকারী। বাবার পেশার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্যই তিনি ওমর খৈয়াম নামটি গ্রহন করেন। ওমর খৈয়াম বেশ ভাগ্যবান। কারণ তিনি ইসলামের সোনালী যুগে জন্মগ্রহণ করেন। যে যুগে ইসলাম ছিল অনেকটা গোঁড়ামিমুক্ত। মানুষজন ছিল বেশ মুক্তমনা ও জ্ঞানপিপাসু। ওমরের বাবা ইব্রাহিম একজন মুসলিম হয়েও ছেলের জন্য ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী এক শিক্ষককে নিয়োগ দেন। এই শিক্ষক কিশোর ওমরকে গণিত, বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ে শিক্ষা দেন। এই শিক্ষকের কাছেই ওমর খৈয়াম ইবনে সিনার দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। ওমর খৈয়ামের প্রথম জীবনের কিছু সময় কেটেছে আজকের আফগানিস্তানের বালক্ শহরে। সেখানে তিনি তখনকার খ্যাতনামা মনীষী মুহাম্মদ মনসুরীর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ঐ সময় খোরাসনের সেরা শিক্ষক ছিলেন ইমাম মোয়াফ্ফেক নিশাপুরি। ওমর খৈয়াম তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১০৬৮ খ্রীস্টাব্দে তিনি সমরখন্দে চলে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর বাবার বন্ধু ও সমরখন্দের গভর্নর আবু তাহিরের অধীনে কাজ শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই ওমরের অসাধারণ গাণিতিক জ্ঞান দেখে তাঁকে সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তােেহর মধ্যে তিনি রাজার কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। এই সময়ে তিনি বীজগণিত চর্চায় মনোনিবেশ করেন।
তাঁর গবেষণা জীবন শুরু হয় বীজগণিত দিয়ে। তিনি অনুধাবন করেন, প্রচলিত গ্রীক পদ্ধতিতে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান সম্ভব নয়। ফলে নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করেন। ১০৭০ খ্রীস্টাব্দে মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি উDemonstration of Problems of Algebra and Balancing (ডেমনস্ট্রেশন অব প্রবলেমস অব অ্যালজেবরা অ্যান্ড ব্যালেন্সিং) নামে একটি বিখ্যাত গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বইটিতে তিনি ঘন সমীকরণের সমাধান এবং জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের সমাধানের একটি সম্পূর্ণ শ্রেণিবিন্যাস উপস্থাপন করেন।
এই বইটি বীজগণিতের সমস্যাগুলির সমাধান এবং ভারসাম্য (নধষধহপরহম) নিয়ে আলোচনা করে। এখানে ‘ব্যালেন্সিং’ শব্দটি সমীকরণ সমাধানের একটি পদ্ধতিকে বোঝায়, যা সমীকরণের উভয় দিকে একই জিনিস যোগ বা বিয়োগ করে সমাধান খুঁজে বের করার একটি পদ্ধতি। তবে এই অসাধারণ কীর্তি নিয়েও অতৃপ্ত ছিলেন তিনি। আর এই অসন্তুষ্টি থেকেই রচনা করেন ‘ট্রিটিজ অন ডেমনস্ট্রেশন অব প্রবলেমস অব অ্যালজেবরা অ্যান্ড ব্যালেন্সিং’। এখানে তিনি সম্পূর্ণ বীজগাণিতিক উপায়ে ত্রিঘাত সমাধান করেন। এই কাজটি তাঁকে প্রথম সারির গণিতবিদ হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
১০৭৩ খ্রীস্টাব্দে ওমর খৈয়ামের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান জালালুদ্দিন মালিক শাহ তাঁকে রাজধানী ইস্ফাহানে আমন্ত্রণ জানান। তাঁর ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয় একটি অপরিবর্তনীয় বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করে দিতে। উল্লেখ্য, তখনকার সময়ে পঞ্জিকাগুলো স্থায়ী ছিল না এবং ঘন ঘন বছরের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করা হতো। ওমর খৈয়ামের পর্যবেক্ষণে এক বছরের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৬৫.২৪২২ দিন। বর্তমানে এক বছরের দৈর্ঘ্য ৩৬৫.২৪২১৮৯ দিন বা ৩৬৫.২৪২২ দিন। ঠিক ওমর খৈয়াম যা বহু বছর আগে করেছিলেন, তা-ই। ওমর খৈয়াম তার বর্ষপঞ্জির কাজ শেষ করেছিলেন ১০৭৮ সালে। পরের বছর থেকেই সুলতান জালালুদ্দিন মালিক শাহ নতুন বর্ষপঞ্জি হিসেবে ওমরের বর্ষপঞ্জি চালু করেন। এই বর্ষপঞ্জির নামকরণ করা হয় সুলতান জালালুদ্দিনের নামে ‘জালালি ক্যালেন্ডার’। এটি একটি সৌর ক্যালেন্ডার যা সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রথম রাজত্বকালে সংকলিত হয়েছিল। ‘জালালি ক্যালেন্ডার’-এর বিভিন্ন রূপ আজও ইরান এবং আফগানিস্তানে ব্যবহৃত হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায়, ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন গনিতজ্ঞ, শিক্ষক, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক, দার্শনিক, সুফী, ক্যালেন্ডার সংস্কারক এবং সর্বোপরি চার পঙক্তিবিশিষ্ট কবিতার জনক। তাঁর দার্শনিক আর শিক্ষক সত্তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল তার কবি পরিচয়। ওমর খৈয়ামের বিখ্যাত রুবাইয়াত এর উপাদান মুলত দুটি। একটি হলো তাঁর কবিতার সৌন্দর্য। তাঁর লীলায়িত ছন্দময় ভঙ্গি, পরবর্তী কবি হাফিজসহ অনেকে প্রবলভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করেন না। কিন্তু তাতে এতটুকু সফলকাম হননি। এছাড়া তাঁর প্রকৃতিপ্রেম নিরস গণিত চর্চাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ যেমন : ক্ষুদ্র ¯্রােতস্বিনী, বুলবুলির গান, টিউলিপ ফুল, উষার আলো, চাঁদনিপসর রাত তাঁর কবিতায় বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। অন্যটি হলো তার সুফী বা দার্শনিক মতবাদ। কবির মতে মানুষের জন্ম-মৃত্যু, ভাগ্য, রুজি-রোজগার সবই পূর্ব নির্ধারিত। কেঁদেকেটে বুক ভাসিয়ে কিংবা মহাকাশকে দায়ী করে কোনো ফায়দা নেই। তাঁর মতে এই দুনিয়া একটি সরাইখানা। এখানে মানুষের অবস্থান স্বল্পসময়ের জন্য। সে রাজাই হোক আর সাধারন মানুষই হোক। ওমর খৈয়াম ছিলেন এক অনতিক্রম্য কাব্য প্রতিভা। ছিলেন নিজ বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। খ্যাতিমান এই দার্শনিক, গণিতবিদ ও কবি ওমর খৈয়াম ১১৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর তার জন্মস্থান নিশাপুরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কবর এমন এক জায়গায় হবে যেখানে বছরে দুবার গাছগুলো আমার উপর ফুল ফোটাবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণীটি তার মৃত্যুর পর সত্য প্রমাণিত হয়েছিল, কারণ তার কবরের উপরে দুটি গাছ এমনভাবে ফুল দিত যে মনে হতো যেন ফুলগুলো তার কবরের উপর ঝরে পড়ছে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক










