কাউছার আলম, পটিয়া
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ আসনে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক বাছাইয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক এনামুল হক এনাম দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই সংগঠনের ভেতরে-বাইরে অসন্তোষ তীব্রতর হয়েছে। মনোনয়ন পাওয়া এনামের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে দলের ৪ সিনিয়র নেতা সাবেক সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহব্বায়ক রেজাউল করিম নেছার এবং যুগ্ম আহব্বায়ক সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু লিখিত অভিযোগ পাঠান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে।
অভিযোগে তারা এনামের মনোনয়নকে ‘বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবিত সিদ্ধান্ত’ বলে দাবি করা হয়। এই অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে বিষয়টি পটিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়।
দলটির এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, এই অভিযোগগুলো গুরুতর। দলের ইমেজের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে মনোনয়ন চাওয়া বিএনপির হেভিওয়েট নেতাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপির সাবেক জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদ কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। এনামুল হক এনাম মনোনয়ন পাওয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। তবে তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ৪ নেতার চিঠি ইস্যুতে এ নেতা আলাদা ভূমিকা পালন করছেন। এ নিয়ে বিএনপির ভেতরে বাইরে নানা গুঞ্জন উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, সৈয়দ সাদাত আহমেদ অভিযোগের চিঠিতে স্বাক্ষর না দেয়ার কারণ হলো কোন কারণে যদি দল থেকে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আনে তাহলে সে সিরিয়ালে সৈয়দ সাদাত আহমেদের নাম রয়েছে। তাই তিনি চিঠিতে স্বাক্ষর করে এ ঝুঁকি নেননি। এ কারণে তিনি পটিয়ার বিভক্ত রাজনীতির মাঠে সরব উপস্থিত থাকছেন না। তিনি আলাদা অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
মনোনয়ন নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত বিএনপি : নভেম্বরের শুরুতে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই পটিয়া বিএনপিতে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যায়। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকেন।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পটিয়া উপজেলা বিএনপি বহুদিন ধরেই অভ্যন্তরীণ গ্রæপিংয়ে দুর্বল। এবার মনোনয়ন ইস্যু সেই বিভেদকে প্রকাশ্যে টেনে এনেছে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না মানলে এ আসন নিয়ে বিএনপি আরও পিছিয়ে পড়বে।
জুয়েল-ইদ্রিস-মিঠু-নেছার গ্রুপের শোডাউন : ১৫ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসে পটিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপির ব্যানারে আয়োজিত শোভাযাত্রা ও সমাবেশে হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় মনোনয়নপ্রাপ্ত এনামের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী নেতাদের অসন্তোষ সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ওইদিনের শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন সাবেক এমপি গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, যুগ্ম আহবায়ক রেজাউল করিম নেছার, যুগ্ম আহবায়ক সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু। এসব কর্মসূচিতে ঐক্যের ছবি ফুটে উঠলেও পর্দার আড়ালে অসন্তোষ কুরে খাচ্ছে। এ উপস্থিতি দলীয় অভ্যন্তরে শক্তির অবস্থানও ইঙ্গিত দেয় বলে জানান রাজনৈতিক পর্যেবক্ষকরা।
সৌজন্য সাক্ষাৎ : মনোনয়ন পাওয়ার পর এনামুল হক এনাম প্রথমে যান নগরীর নন্দনকাননে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার বাসভবনে। পরে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সাবেক এমপি গাজী শাহজাহান জুয়েলের চান্দগাঁও আবাসিক বাসায়। এই সাক্ষাৎকে অনেকেই ‘দলীয় ঐক্যের প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন। তবে কী বিষয়ে কথা হয়েছে এ বিষয়ে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। অন্যদিকে, অন্য হেভিওয়েট নেতাদের সঙ্গে এখনো এনামের কোনো দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।
তৃণমূলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টগুলোতে দেখা যাচ্ছে- বিএনপির কর্মীরা মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে ‘অস্বচ্ছ’ বলছেন। কেউ কেউ এনামকে ‘থার্ড পার্টি ইনফ্লুয়েন্সড প্রার্থী’ বলেও অভিযোগ করছেন। তৃণমূলের একাংশ প্রকাশ্যে জুয়েল-ইদ্রিস গ্রুপের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন এই বিভাজনের প্রভাবে পটিয়া আসনে বিএনপি কতটা সংঘটিতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি শুধু একটি মনোনয়ন বিতর্ক নয়, বরং দীর্ঘদিনের গ্রুপিংয়ের বিস্ফোরণ। মনোনয়ন নিয়ে এই সংঘাত পটিয়ায় বিএনপিকে দুর্বল করতে পারে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। দলের ভেতরের এই দ্বন্দ্ব যদি দ্রুত মীমাংসা না করা যায় নির্বাচনের ঠিক আগে স্থানীয়ভাবে ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে রাজনৈতিক হিংসা-সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়বে। ২৯ নভেম্বর শনিবার বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এনামুল হক এনামের নেতৃত্বে পটিয়ায় গণমিছিল বের করার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার পটিয়া উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সব বিশ্লেষণ মিলিয়ে পটিয়া আসনের বিএনপি প্রার্থীকে ঘিরে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা হলো এনামুল হক এনামই দলীয় চূড়ান্ত প্রার্থী এ নিয়ে আর দলের মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেন্দ্রীয় নির্দেশ স্পষ্ট যে, মনোনয়ন বঞ্চিতরা সিদ্ধান্ত মেনে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ এখনো বিদ্যমান। বিপরীতে পটিয়ার নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় আছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম, এলডিপি মনোনীত প্রার্থী শিল্পপতি এম এয়াকুব আলী, গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী ডা. এমদাদুল হাসান।











