শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বানের পানির মত আসছে স্বর্ণের বার। বিদায়ী বছরের শেষ তিন মাসের মত নতুন বছরেও বিদেশফেরত যাত্রীদের ব্যাগেজ রুলের আওতায় শুল্ক পরিশোধ করে স্বর্ণের বার ছাড় করানোর প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। কেবল গত জানুয়ারি মাসেই যাত্রীরা বিমানবন্দর কাস্টমসে শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে ছাড় করিয়ে নিয়েছেন ১১ হাজার ৬২ পিস স্বর্ণের বার। আর বিদায়ী বছরের শেষ তিন মাসসহ গত চার মাসের হিসাবে স্বর্ণের বার ছাড় করা হয়েছে চার মেট্রিক টন। স্বর্ণের বারের সিংহভাগই নিয়ে আসছেন দুবাইফেরত যাত্রীরা।
আন্তর্জাতিক বাজারের মত দেশের জুয়েলারি শিল্প খাতেও স্বর্ণের দামে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার মধ্যেই হঠাৎ করে বৈধ পথে বা শুল্ক পরিশোধ করে রেকর্ড ছাড়িয়ে স্বর্ণের বার আমদানির প্রবণতাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, দেশের স্বর্ণের বাজারে বিদ্যমান চাহিদার পাশাপাশি করোনাকালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতে বিদ্যমান অনিশ্চয়তার মধ্যে বৈধ পথে এত বেশি পরিমাণে স্বর্ণের বার আমদানি করার মত কোনও প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা নেই। তাই শুল্ক পরিশোধ করে এসব স্বর্ণের বার দেশে আনা হলেও সেগুলোর গন্তব্য ভিন্ন। দেশের স্বর্ণশিল্প খাতে আমদানি করা এসব স্বর্ণের বার আসছে না। বরং সীমান্তপথে প্রতিবেশি দেশ ভারতই হল এসব স্বর্ণের বারের গন্তব্যস্থল। তাছাড়া প্রবাসীদের মধ্যে বিশেষ করে মধ্যপ্রচ্যের দুবাই থেকে যারা স্বর্ণের বার নিয়ে এসে বিমানবন্দরে শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে ছাড় করাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই মূলত শ্রমিক শ্রেণির। তাদের আয় ও জীবনযাপনের ধরনের সঙ্গেও স্বর্ণের বার আমদানির বিষয়টি ততটা সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। এসব স্বর্ণের বার স্থল সীমান্ত ব্যবহার করে চোরাপথে প্রতিবেশি দেশ ভারতে ঢুকছে বা অবৈধ কারবারে লেনদেন করা হচ্ছে। বিশ্বে স্বর্ণ ব্যবহারকারীর তালিকায় একেবারে শীর্ষে অবস্থান করা ভারতে স্বর্ণের বার পাচারের ক্ষেত্রে সক্রিয় চোরা কারবারিচক্রই এর নেপথ্যে থাকতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে বৈধ-অবৈধ বিভিন্ন উপায় ও কৌশলে তারাই স্বর্ণের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, দুবাই থেকে বিমানের ফ্লাইট এলেই মিলছে শত শত পিস স্বর্ণের বার। বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সর্বশেষ গত চার মাসে বিমানবন্দর কাস্টমসে শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে ছাড় করানো হয়েছে ৩৪ হাজার পিস বা চার মেট্রিক টন স্বর্ণের বার। এতে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত জানুয়ারি মাসেই বিদেশফেরত যাত্রীরা বৈধ পথে ১১ হাজার ৬২ পিস স্বর্ণের বার এনেছেন। তার আগের মাসে অর্থাৎ বিদায়ী বছরের ডিসেম্বরে শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণের বার ছাড় করানো হয়। যার পরিমাণ ছিল ১১ হাজার দুইশ’ ৬০ পিস। আর গত নভেম্বরে বিমানবন্দর দিয়ে পাঁচ হাজার যাত্রী নয় হাজার তিনশ’ ৬৭টি স্বর্ণের বার শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে ছাড় করিয়েছেন। কিলোগ্রাম বা কেজির এককে হিসাব করলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় এক হাজার ৯২ কেজি অর্থাৎ এক টনেরও বেশি। বর্তমান বাজারমূল্যে ওই স্বর্ণের বারের দাম প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ কোটি টাকা। এর পূর্ববর্তী দুই মাসের মধ্যে গত অক্টোবরে বিমানবন্দর দিয়ে ব্যাগেজ রুলের আওতায় ছাড় করানো হয়েছে দুইশ’ ৫৯ কেজি ওজনের দুই হাজার দুইশ’ ২৪টি স্বর্ণের বার। আর গত সেপ্টেম্বরে ছাড় করা হয় পৌনে চার কেজি ওজনের স্বর্ণের বার। তাই গত কয়েক মাসে শাহ আমানত বিমানবন্দর কাস্টমসে ব্যাগেজ রুলের আওতায় কেবল স্বর্ণ আমদানি খাতে গড়ে ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দেশে দেশে জারি করা লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থা ধীরে ধীরে তুলে নেয়ার পর মূলতঃ গত সেপ্টেম্বর থেকেই আন্তর্জাতিক রুটে সীমিত আকারে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল শুরু হয়। এর মধ্যে বিদায়ী বছরের পয়লা ও ১৫ অক্টোবর বিমানবন্দরে দায়িত্বরত জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ বিমানের পৃথক দুটি ফ্লাইট থেকে অবৈধ পথে নিয়ে আসা দুইশ’ ৪২ পিস স্বর্ণের দুটি চালান জব্দ করে। মূলত এরপর থেকেই বিমানবন্দর কাস্টমসে শুল্ক পরিশোধ করে স্বর্ণের বার ছাড় করানোর হিড়িক পড়ে। এর আগে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের পুরো সময়জুড়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে শুল্ক পরিশোধ করে বা বৈধ পথে সবমিলিয়ে একশ’ চার কেজির কিছু বেশি স্বর্ণের বার এনেছিলেন বিদেশফেরত যাত্রীরা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বৈধ উপায়ে স্বর্ণ আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪৫ গুণ বেড়েছে।
বৈধ পথে আনা এসব স্বর্ণের বার অলঙ্কারে রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যবহারের উপযোগী করতে হলে সেগুলো দেশের বাজারে বা স্বর্ণের দোকানে নিয়ে যেতে হবে। তবে জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব স্বর্ণের বারের সিংহভাগই অলঙ্কারে রূপান্তর করার জন্য তাদের কাছে আসছে না।
জুয়েলারি সমিতি (বাজুস)- এর চট্টগ্রাম শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্বপন চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, ব্যাগেজ রুলের আওতায় আনা স্বর্ণের সামান্য পরিমাণ হয়তো দেশের বাজারে আসতে পারে। তবে বাজারে চাহিদার তুলনায় এত বেশি পরিমাণে নিয়ে আসা স্বর্ণ আসলে কোথায় যাচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। বিদেশফেরত যাত্রীরা হঠাৎ কী কারণে এত স্বর্ণ এনে মজুত করছে তাও স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না। অথচ বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ছে আর টাকার মান কমছে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, ব্যাগেজ রুলের আওতায় একজন বিদেশফেরত যাত্রী শুল্ক-কর পরিশোধের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০ ভরি বা দুটি স্বর্ণের বার আনতে পারেন। এ জন্য প্রতি ভরিতে (১১ দশমিক ছয়শ’ ৬৪ গ্রাম) শুল্ক-কর দিতে হয় ২ হাজার টাকা করে। এছাড়া স্বর্ণের বারের বাইরে একজন যাত্রী বিনা শুল্কে একশ’ গ্রাম ওজনের (প্রায় সাড়ে আট ভরি) স্বর্ণালংকার আনতে পারবেন। তবে স্বর্ণালংকারের মধ্যে একই ধরনের ১২ টির বেশি হওয়া যাবেনা। ব্যাগেজ রুলের পাশাপাশি সরকার ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত স্বর্ণ আমদানি নীতিমালা প্রণয়ন করে। এ নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানি করে আসছে। তবে নতুন নীতিমালার আওতায় এক বছরে মাত্র ২৫ কেজি স্বর্ণ আমদানি করেছে দুটি প্রতিষ্ঠান। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানির জন্য আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত তার অনুমোদনই মিলেনি।










