এখন ভালো মানুষের বড় অভাব

1

নাসের রহমান

দোষে গুণে মানুষ। যে কোনো মানুষের মাঝে গুণ যেমন আছে তেমন দোষও আছে। দোষ ছাড়া কোনো মানুষ নেই। আবার শুধু গুণ আছে এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। শুধু দোষ আছে কোনো গুণ নেই এরকম মানুষও থাকতে পারে। দোষ গুণের হিসাব করলে বেশির ভাগ মানুষের মাঝে গুণের ভাগ বেশি। বহু মানুষের কাছে গুণের ভাগ অনেক বেশি। কোনো কোনো মানুষের এতো বেশি গুণ হিসাব করা যায় না। এসব মানুষেরও কিছু কিছু দোষত্রুটি আছে। অর্থাৎ অনেক গুণী মানুষেরও দোষ আছে। অনেক গুণের মাঝে দুএকটা দোষ ত্রুটি থাকলে কিছু যায় আসে না। কিন্তু এসব দোষের কথা বেশি প্রকাশ পায়। যদিওবা দোষকে চাপা দেয়ার কথা বলা হয়। গুণের কথাকে বেশি করে প্রকাশ করার জন্য বলা হয়। কেউ কেউ বলে দোষ কখনো চাপা থাকে না। কেউ বলে পাপ কখনো চাপা থাকে না। সব দোষে পাপ হয় কিনা বলা যায় না। ভালো কিছু করতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো দোষী হয়ে যায়। অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া কখনো গুণ হতে পারে না। দোষ কিনা তা সব সময় বলা যায় না।
মানুষ আসলে ভালো মানুষ হতে চায়। সৎভাবে জীবন যাপন করতে চায়। যোগ্যতা অর্জন করতে চায়। দক্ষতা অর্জন করতে চায়। সম্মানজনকভাবে বাঁচতে চায়। অসৎ পথ পরিহার করতে চায়। কিন্তু মানুষের মাঝে গুণের আধিক্য থাকলেও দোষ মাঝে মাঝে অসৎ পথে নিয়ে যায়। মানুষ স্বভাবতই গুণকে ধারণ করলেও দোষ বা ত্রæটিমুক্ত হতে পারে না। কোনো দুর্বল মুহুর্তে দোষ নিজের জায়গা করে নেয়। দোষ একবার জায়গা করে নিতে পারলে আর সহজে ছাড়ে না। আধিপত্য বিস্তার করতে না পারলেও গুণের পাশাপাশি চলতে থাকে। মাঝে মাঝে গুণকে বাধাগ্রস্ত করে দিতে চায়। হয়তো পারে না। মানুষ যেহেতু গুণকে বেশি প্রাধান্য দেয়। মানুষ গুণের মাঝে থাকতে চায়। গুণগান পছন্দ করে। দোষকে চাপা দিতে চায়। দোষকে ঢেকে রাখতে চায়। কিন্তু দোষ চাপা থাকতে চায় না। প্রকাশ পাওয়া যেন তার স্বভাব। এজন্য মানুষ না চাইলেও দোষ প্রকাশ পেয়ে যায়। ছোট খাট দোষ বড় বড় গুণকে ছাপিয়ে প্রকাশ্যে চলে আসে। যোগ্যতা দক্ষতা থাকা সত্তে¡ও ভালো মানুষটি আর ভালো থাকে না।
অনেক গুণের অধিকারী হলেও মানুষ দোষটা নিজের কাছে রাখতে চায় না। অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চায়। এ প্রবণতা অনেকের মাঝে আছে। নিজে দোষ করে অন্যকে জড়িয়ে ফেলার প্রবণতা। অন্যকেও দোষী সাব্যস্ত করা। নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে পারলে সে নিজেকে কিছুটা হালকা মনে করে। দোষটার দায়ভার ভাগ হয়ে গেলে তার উপর চাপ কম হয়। দোষের অপবাদ তাকে একা বহন করতে হয় না। তবে মানুষ গুণের ভাগীদার হতে চায়। কেউ দোষের ভাগীদার হতে চায় না। ভালো কাজে মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে আগ্রহী হয়। শরীক হতে চায়। কিন্তু মন্দ কাজে কেউ স্বেচ্ছায় জড়ায় না। খারাপ কাজ থেকে সবাই দূরে থাকতে চায়। যে কাজ করলে অন্যের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয় এমন কাজ কেউ করতে চায় না। লোভে পড়ে বা বিভিন্ন ফাঁদে পড়ে অনেকে মন্দ পথে পা বাড়ায়। কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়ে। সবকিছু ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না। তবে কেউ সৎ পথে থাকতে চাইলে তাকে সহজে টলাতে পারে না।
অধিকাংশ মানুষ সম্পদের মালিক হতে চায়। সম্মান চায়, খ্যাতি চায়। অনেকে প্রভাব প্রতিপত্তি চায়। কেউ কেউ ক্ষমতাবান হতে চায়। সবাই সুনামের সাথে বসবাস করতে চায়। তবে বেশির ভাগ মানুষকে সাধারণভাবে জীবন যাপন করতে হয়। এসব সাধারণ মানুষের উপর ক্ষমতাবানেরা প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করতে চায়। একে অন্যের উপর আধিপত্যও বিস্তার করে। এতে কারো কারো সুনাম হয় আবার অনেকের দুর্নাম হয়। দুর্নাম ঢাকা দেয়ার জন্য এরা নানা কৌশল অবলম্বন করে। যদিওবা তা সাময়িকভাবে চাপা থাকলেও সময়ে প্রকাশ পেয়ে যায়। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্নাম ঘুঁচাতে অনেকে ভালো কাজের আশ্রয় নেয় আবার কেউ কেউ অন্য পথ বেঁচে নেয়। মন্দ পথ-যে পথে হাঁটলে দোষ বাড়ে। ক্ষমতাবানরা প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করতে গিয়ে যে পথে অগ্রসর হয় তা প্রায় সময় ভালো পথ নয়। অনেক সময় মন্দ পথে গিয়ে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চায়। আর লোভী যারা তারা সম্পদ আহরণের জন্য নানা পথ অবলম্ব করে থাকে। কেউ কেউ আবার নিজের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য অবৈধ পথ অনুসরণ করে। লোভ লালসা ক্ষমতা মানুষকে মন্দ পথে নিয়ে যায়।
মন্দ কাজ কেউ পছন্দ করে না। কেউ মন্দ কাজ করতে চায় না। তারপর সমাজে অহরহ মন্দ কাজ হয়। ভালো কাজ করে সবাই তৃপ্তি পায়। ভালো কাজ করলে কল্যাণ হয়। সবাই ভালো কাজের মধ্যে থাকতে চায়। কিন্তু ভালো মন্দ মিলে সমাজ। সবকিছু ভালো হয় না। আবার মন্দের ভাগ বেশি হয়ে গেলে সমাজ কলুষিত হয়ে যায়। মানুষ সমাজে ভালোভাবে বসবাস করতে পারে না। মন্দের প্রভাবে ভালোরা কোণঠাসা হয়ে থাকে। অনেক সময় মানুষ ভালো মন্দের পার্থক্য নির্নয় করতে পারে না। অনেকে ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ বলতে পারে না। মন্দ কাজে কেউ বাধা দিতে আসে না। ভালো কাজও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ভালোর সংখ্যা কমতে থাকে। মন্দের আধিক্য ঘটে। তরুণরা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে যায়, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ভালো মন্দ সত্য মিথ্যা ন্যায় অন্যায় একাকার হয়ে যায়। তখন মানুষ ভালো মন্দ বিচার করতে পারে না।
মন্দরাই অধিপত্য বিস্তার করে থাকে। ভালোরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। মন্দের শাসন চলে। কেউ কাউকে মানে না। দোষ গুণের বাচ-বিচার হয় না।
জ্ঞানী-গুণী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, বিত্তবান, মধ্যবিত্ত, শিল্পপতি-সমাজপতি, খ্যাতিমান- ক্ষমতাবান আরো কতো ধরনের মানুষ বসবাস করে সমাজে। চেষ্টা করলে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে। এমনকি শীর্ষেও পৌঁছে যেতে পারে। অঢেল ধন সম্পদের মালিক হতে পারে। ক্ষমতাধর কেউ হতে পারে, সম্মানিত ব্যাক্তিও হতে পারে। কিন্তু সহজে ভালো মানুষ হওয়া যায় না। ভালো মানুষ হতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। লোভ লালসা বিসর্জন দিতে হয়। অনিয়মের উর্ধ্বে থাকতে হয়। অন্যায় অবিচারকে প্রশ্রয় দেয়া যা না। অন্যায়ের সাথে আপোষ করা যায় নাা। অন্যায়ের থেকে দূরে থাকা নয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়। এজন্য জ্ঞানী গুণী বা পন্ডিতেরা সব সময় ভালো মানুষ হয় না। অন্যান্য পেশাজীবীরাও সহজে ভালো মানুষ হতে পারে না। অনেক সময় সহজ সরল পথে ভালো মানুষ থাকা যায়না। ভালো মানুষকে কঠিন পথ বেচে নিতে হয়। বাধা বিঘ্ন উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সাথে কঠিন পথকে আকড়ে ধরে থাকতে হয়। অন্যথায় সমাজে অনেক কিছু হওয়া যায়। অনেক কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া যায় না। একজন্য সমাজে ভালো মানুষের বড় অভাব।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী