নাসের রহমান
মানুষ কারো ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। কোথাও ভরসার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। কাউকে ভরসা করতে পারছে না। কারো কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। কাউকে আস্থায় আনতে পারছে না। সব কিছু সন্দেহ আর অবিশ্বাসের জালে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। আস্থাহীনতার সংকটে পড়ে গিয়েছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। অবিশ্বাস ও আনাস্থা চলমান ধারাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ব্যক্তির ওপর ব্যক্তির আস্থা নেই, গোষ্ঠীর ওপর গোষ্ঠীর। দলকেও কেউ বিশ্বাস করে না। এমনকি নেতার কথায়ও আস্থা রাখতে পারে না। সকালে এক কথা, দুপুরে আরেক কথা, বিকেলে অন্য কথা। আবার রাতে একেবারে ভিন্ন কথা। কথার ঠিক নেই, প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করে না। পদে পদে মত পাল্টায়। সবকিছুতে যেন মানিয়ে চলতে চায়। এতে করে কেউ আর আস্থা রাখতে পারে না। বড় ছোট মাঝারি কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এমনকি সাধারণরাও কারো কথায় আস্থা রাখতে পারে না।
আগামী সম্পর্কে কিছুই বলা যায় না। এক সপ্তাহ পর বা পনের দিন পর কিংবা এক মাস পর কি হবে বলা যায় না। চলমান কথার ধারাবাহিকতা থাকবে কিনা, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ হবে কিনা বলা যায় না। ধারাবাহিকতা কেউ রক্ষা করতে চায় না। কয়েক দিন পর পর নতুন কিছু এসে যুক্ত হয়। নতুন করে তর্ক বির্তকের সুচনা হয়। পক্ষ বিপক্ষও তৈরি হয়ে যায়। প্রাসঙ্গিকতার চেয়েও যুক্তিতর্ক বড় হয়ে যায়। এতোদিনের অগ্রগতি খানিকটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। মাঝে মাঝে হোঁচট খায়। কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় আলোচনায় মূল বিষয় আড়ালে পড়ে যায়। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়টির জোরালো হয়ে যায়। আলোচনা বাক বিতন্ডায় রূপ নেয়। পাল্টাপাল্টি রেষারেষি শুরু হয়ে যায়। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারূপ করে। পারস্পরিক বুঝা পড়াকে গুরুত্ব না দিয়ে ছোট খাট বিষয় নিয়ে জটিলতার দিকে যায়। অনিশ্চয়তার দিকে চলে যায়। এমন সব বিষয়ের অবতারণা করে যা সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায় না।
কোনো বিষয়ে সবাই যে একমত হবে তা নয়। ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে যে সব বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে মতৈক্য পৌঁছা যায় সেখানে ভিন্নমতের সুযোগ নেই। ঐকমত্য একবার তৈরি হলে তা ধরে রাখা প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য হবে তাও নয়। ঐকমত্য ছাড়া বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া যায় না। অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা যায় না। মত পথের পার্থক্য থাকলেও অভিন্ন বিষয়গুলোতে ঐকমত্যের বিকল্প নেই। বিশেষ করে জাতীয় ইস্যুগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হয়। সংস্কারের বিষয়ে মত ভিন্নতা থাকলেও অসুবিধা নেই। সংষ্কার চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সাথে সংস্কার চলমান থাকবে। কোন পথে সংস্কার হবে, কি উপায়ে এগিয়ে যাবে এসব নিয়ে ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমতের অবকাশ নেই। নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এসব নিয়ে সময়ক্ষেপণ করলে নির্বাচন অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।
নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন। যে নির্বাচনে মানুষ অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। যে কোনো নাগরিকের এটা মৌলিক অধিকার। এ মৌলিক অধিকারের ব্যাপারে মানুষ নিশ্চিত হতে পারছে না। সরকার চায় ভালো নির্বাচন, কমিশন চায় ভালো নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো চায় ভালো নির্বাচন। জনগণও চায় ভালো নির্বাচন। সবাই যদি ভালো নির্বাচন চায় তাহলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না কেন? কোথাও ভরসার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। এমন কেউ কি নেই যার ওপর আস্থা রাখা যায়, যাকে ভরসা করা যায়।
আসলে নির্বাচনে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নেই, বিশ্বাস নেই। বিভিন্ন অংশীজনরা নিজেদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করে। কেউ কাউকে মানতে চায় না। কারো কথা কেউ শুনতে চায় না। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে বিশ্বাস করতে পারে না। এক দল আরেক দলকে দোষারোপ করে। শুধু দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করে তুলতে চায়। নানাবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করে যেগুলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। অযৌক্তিক প্রসঙ্গ টেনে এনে কমিশনকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়। সরকারকেও নানাভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন করা হয়। বিতর্কিত বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজে বের করার চেয়ে পরস্পরের ভুলত্রুটি নিয়ে কালক্ষেপণ করা হয়। সমাধানের সহজ পথে না গিয়ে জটিলতার দিকে ধাবিত হয়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। কারো মাঝে সহনশীল মনোভাব লক্ষ করা যায় না। যে যার যুক্তি তর্ক ও এজেন্ডায় অনঢ় থাকতে চায়। এর ফলে পারস্পরিক আস্থা বা বিশ^াসের জায়গাটায় সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। যা অনিশ্চয়তার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে মানুষ সোচ্চার হলে কর্তৃপক্ষ আশ^াস দেয়। দাবী খুব জোরালো হলে সর্বোচ্চ মহল থেকে আশ^স্ত করা হয়। কিন্তু এ ধরনের আশ্বাসে কেউ আশ^স্ত হতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আশ^াস অনুযায়ী কিছুই হয় না। কোনো কাজ হয় না। আশ্বাস আশ্বাসে থেকে যায়। তার আর বাস্তবায়ন হয় না। আলোর মুখ দেখে না। আশ^াসের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে। এজন্য এখন কেউ আর আশ্বাসে আশ্বস্ত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয় না। প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী কোনো কাজ হয় না। ফলে কেউ আর এসব বিশ্বাস করে না। আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি নিয়ে কেউ আর সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। কারো আশ্বাসে ভরসা করতে পারে না। কাউকে আস্থায় নিয়ে চলতে পারে না। কারো ওপর বিশ্বাস বা আস্থা রাখতে পারে না। আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি কোনোটাই রক্ষা করা হয় না। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যে অত্যন্ত জরুরি তাও অনুধাবন করে না। বিশ্বাস ভঙ্গ যে কতো ক্ষতিকর তার মানতে চায় না। এসব রক্ষা করার চেয়ে না করার প্রবণতা অনেক বেশি।
কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠী বা দল খুঁজে পাওয়া যায়, না যার ওপর ভরসা রাখা যায়। এমনকি কোনো নেতাও নেই যাকে ভরসা করা যায়। নেতা তৈরি হতে হয়। একজন নেতা তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের নেতা তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের নেতা যাকে বলা যায়। অনেকে রাজনৈতিক নেতা বলে। সেরকম নেতাও নেই, নেতৃত্বও নেই। বিশেষ কাউকে সাময়িক নেতা মানা যায়। অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠতে পারে। আশা জাগাতে পারে। আকাক্সক্ষা পূরণের অঙ্গিকার করতে পারে। কিন্তু অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বাস্তবায়ন করতে পারে না।
আসলে মানুষের সমস্যা বুঝতে হলে মানুষের সাথে মিশতে হয়। মানুষের সুখ দুঃখের অংশীদার হতে হয়। মানুষের অধিকার আদায়ে মানুষের সাথে থাকতে হয়। জনবিচ্ছিন্ন কেউ জনগণের নেতা হতে পারে না। জনগণের অভাব অভিযোগ কাছ থেকে দেখতে হয়। জনগণের ভেতর থেকে জননেতা গড়ে ওঠে। রাজনীতিতে সে সুযোগ না থাকলে গনমানুষের নেতা তৈরি হয় না। অন্যভাবেও নেতা হওয়া যায়। কিন্তু এরা কখনো জনগণের দুঃখ দুর্দশা লাঘব করতে পারে না। এদের ওপরে জনগণ ভরসা রাখতে পারে না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী










