দেশের কোথাও শান্তিতে নেই মানুষ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা সব জায়গায় চলছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন-খারাবি, মব সন্ত্রাস। সম্প্রতি এসব অপরাধের সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই যেন রাজনৈতিক সংঘাত, দলীয় কোন্দল ও সন্ত্রাস বেড়েই চলছে। সম্প্রতি খুলনার আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে ও কুপিয়ে দু’জন পথচারিকে হত্যার ঘটনায় অনুমান করা যায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা। হাসিব হাওলাদার এবং ফজলে রাব্বি ওরফে রাজন নামক নিহত ব্যক্তিদ্বয় পুলিশের ভাষ্য মতে সন্ত্রাসী। তারা খুলনার সন্ত্রাসী গ্রæপ পলাশ বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা সন্ত্রাসে সক্রিয় ছিলেন এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিদ্ব›দ্বী সন্ত্রাসী গ্রুপ রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর অনুসারীরা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন। জানা যায়, সোনাডাঙ্গা থানায় একটি মামলার হাজিরা দিতে এসে তারা প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছেন। শুধু এই জোড়া হত্যাকান্ডের ঘটনাই নয়, ওইদিন ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনায় আরও একটি গুলির ঘটনা ঘটেছে। জিন্নাহপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে একজন আহত হয়েছেন। সাম্প্রতিককালে খুলনা মহানগরী সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গুলি, খুন প্রায় প্রতি সপ্তাহের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ খুবই সক্রিয়। পূর্বোল্লিখিত পলাশ গ্রুপ ও গ্রেনেড বাবু গ্রুপের পাশাপাশি রয়েছে আশিক গ্রুপ। একই সঙ্গে চরমপন্থী কিছু গ্রুপও অতি তৎপর হয়ে উঠেছে। খুলনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন ও আতংকে দিন কাটাচ্ছে। পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা নগরীতে ৪৬টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ১৯। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় এক সন্ত্রাসী গ্রুপ আরেক সন্ত্রাসী গ্রুপকে মারছে, হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে, কিন্তু পুলিশ নির্বিকার। তারা ঘটনায় নিহতদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েই যেন দায় সারাতে চায়! এজাতীয় ঘটনা ঢাকা ও চট্টগ্রামেও ঘটছে। নভেম্বর মাসে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যেভাবে একের পর এক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনে নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুনখারাবি, হত্যা ও অগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি সারাদেশেই বেড়ে যেতে পারে। তার আলামত ইতোমধ্যেই লক্ষ করা গেছে। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদউল্লাহর গণসংযোগের সময় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে বাবলা নামের একজন নিহত হন। এরশাদ উল্লাহ স্বয়ং গুলিবিদ্ধ হন। তিনি এখনো চিকিৎসাধীন আছেন। জানা যায়, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরোধের কারণে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, হানাহানি, মারামারি, খুন-খারাবির ঘটনা ততই বাড়ছে। ক’দিন আগে পাবনায় বিএনপি-জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে এক যুবকের অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। এ ধরনের ঘটনা একইসঙ্গে অনভিপ্রেত ও উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়া এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর খুলনায় প্রকাশ্য হত্যাকান্ড সামগ্রিকভাবে একটি বার্তাই দেয় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংসতা ও হত্যাকান্ড নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে গভীর শঙ্কার জন্ম দিতে বাধ্য।
মানবাধিকার সংস্থা এনএসএফের প্রতিবেদনের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, নভেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার সংখ্যা অক্টোবরের ৪৯ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২-এ। আহত ব্যক্তির সংখ্যা একলাফে ৫৪৭ থেকে ৭২৪ এবং নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ২ থেকে ৯ এই ঊর্ধ্বগতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক সহিংসতা যখন মাসে মাসে বাড়ে, তখন তা নির্দেশ করে যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা মিলেমিশে সমাজে একধরনের সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করেছে।
গণপিটুনির পুনরুত্থান ভয়াবহ সংকটের ইঙ্গিত দেয়। আইনকে পাশ কাটিয়ে সংঘবদ্ধ জনতা বিচার করছে এমন প্রবণতা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাকর। নভেম্বর মাসে ৪৩টি ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু, অক্টোবরে নিহত হয়েছেন ১২ জন এ সংখ্যাগুলো শুধু হত্যার পরিসংখ্যান নয়; এ সংখ্যা আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা হারানোর ইঙ্গিত। চুরি, ছিনতাই বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগেই হোক, আইনের শাসন ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেয়। অথচ অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা, গণপিটুনি ঠেকাতে তৎপরতা দেখানো এসব দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
নভেম্বরে কারা হেফাজতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ক্ষেত্রে অসুস্থতার কথা বলা হলেও সেটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারাগারের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা কি এই মৃত্যুর কারণ? বারবার তদন্তের দাবি উঠলেও দায় নির্ধারণ বা কাঠামোগত সংস্কারের কোনো অগ্রগতি নেই।
আমরা মনে করি, রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান এখনই এসব পদক্ষেপ নিতে হবে।











