প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায় দেখার পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং গৃহায়ন মন্ত্রণালয়ও অন্যায় করেছে বলে পর্যবেক্ষণে তুলে ধরে আদালত বেআইনি ও একাধিক প্লট ভোগকারীকে শনাক্তের নির্দেশ দিয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
অতীতের সব বরাদ্দ পর্যালোচনা করে রায়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন।
এর পরের করণীয় হিসেবে পুনরুদ্ধার হওয়া সব প্লট শুধু ভূমিহীন নাগরিক ও যোগ্য আবেদনকারীদের পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
গতকাল বৃহস্পতিবার রায়ের পর্যবেক্ষণে তিনি সরকারি আবাসন ও জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক অসদাচরণের প্রেক্ষিতে রাজউক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে বিশেষ সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনাও দেন। উভয় প্রতিষ্ঠানের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশও দেন বিচারক।
রায়ে তিন মামলাতেই শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে ৭ বছর করে মোট ২১ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার পাশাপাশি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে একটি মামলায় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে আরেক মামলায় পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনা : ১. সব অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি মামলা করতে হবে। ২. ওই সময়ে দেওয়া সব বরাদ্দের ওপর স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ফরেনসিক অডিট করতে হবে। ৩. বরাদ্দের জন্য ডিজিটাল লটারি চালু করতে হবে; লাইভ সম্প্রচার, অডিট ট্রেইল ও এনক্রিপ্টেড সিস্টেম বাধ্যতামূলক। ৪. বেআইনি বরাদ্দ অনুমোদন করা কর্মকর্তারা যৌথভাবে দায়ী হবেন এবং চাকরি থেকে বরখাস্তসহ তাদের ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি করতে হবে। ৫. দুর্নীতি প্রকাশকারী হুইসেল-ব্লোয়ারদের আইনি সুরক্ষা ও পুরস্কার দিতে হবে। ৬. গৃহহীন, নিম্ন আয়ের শ্রমিক ও অনিরাপদ পরিবেশে বসবাসকারী পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে পয়েন্টভিত্তিক যোগ্যতা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ৭. একক মা, প্রতিবন্ধী, নিম্ন আয়ের পরিবার ও সরকারি চাকরি শেষে আবাসনহীনদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ রাখতে হবে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ : রায়ে বলা হয়েছে, আবাসন বিষয়ক মন্ত্রণালয়টি রাজউককে সঠিকভাবে তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের তদারকি ছিল নামমাত্র। বরং মন্ত্রণালয় নিজে ‘বিশেষ শ্রেণি’ বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় বেআইনি প্রভাব খাটিয়েছে। এতে নিয়ম ভঙ্গের পরিবেশ আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনা : ১. সরকারের বিশেষ সুপারিশ নীতিমালা বাতিল করতে হবে। ২. বিশেষ শ্রেণির বরাদ্দ সংক্রান্ত কোনো সুপারিশ চলমান থাকলে তা বাতিল এবং নতুন করে এই শ্রেণিতে কোনো বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। ৩. মন্ত্রণালয়কে রাজউকের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। ৪. স্বাধীন নজরদারি ইউনিট গঠন করতে হবে। ৫. অনিয়মে জড়িত মন্ত্রণালয়সহ রাজউকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে। ৬. জাতীয় সম্পত্তি ডাটাবেস, ভূমি রেকর্ড, সিটি করপোরেশন হোল্ডিং, সাবরেজিস্ট্রি ও টিআইএন নম্বরের সঙ্গে রাজউকের ডিজিটাল সংযোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৭. আবেদনকারীর তালিকা, যোগ্যতার ভিত্তি, প্লট নম্বর ও সুবিধাভোগীর তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। ৮. ডিজিটাল লটারি, পয়েন্টভিত্তিক স্কোরিং ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার বাধ্যতামূলক। ৯. দুর্নীতি উন্মোচনকারী কর্মীদের জন্য আইনি সুরক্ষা ও পুরস্কার নিশ্চিত করতে হবে।










