একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্যক অবস্থান এবং শিক্ষকদের আন্দোলন

2

মিঞা মুহাম্মদ জামশেদ উদ্দীন

হঠাৎ শিক্ষকদের আন্দোলন এবং প্রশাসনের সাথে উদ্ধৃত পরিস্থিতি। এটি দেশের সাধারণ জনগণেরও দৃষ্টিগোচর হয়। যা কি-না এসময়ের আলোচিত “ টপ দ্য কান্ট্রিতে “ পরিণত হয়। শেষতক কি হলো এ আন্দোলনে এবং এর প্রাসঙ্গিক অবস্থা সম্পর্কে জানাশোনা ও খুঁজখবর রাখাটা অনুভবে আসে। আমাদের বাড়ির পাশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। দোয়াজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড উপজেলার অন্তর্গত। আমি এ বিদ্যালয়ে পড়েছি শৈশবে, অনেক স্মৃতিও আছে এ স্কুলকে ঘিরে। যদিওবা এখন স্কুলটিতে তেমন-একটা যাওয়া হয় না, বা যাওয়ার প্রয়োজনবোধ করি না।
২০২৪ইং ৫ জুলাইয়ের পরিবর্তন-পরিস্থিতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি নেই বললে চলে; নেই বলতে চলতি দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সভাপতি পদে। কমিটির অপর সদস্যরা হলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারী শিক্ষক প্রতিনিধি, একজন স্থানীয় প্রতিনিধি ও একজন প্রতিষ্ঠাতা বা দাতা সদস্য। এ ৫ সদস্য বিশিষ্ট স্কুল পরিচালনা কমিটি।
১১-১১-২০২৫ ইং দুপুর ২টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গন্তব্যে যেতেই ঢুস দেওয়া হয় শৈশবে পড়া স্কুলটিতে। স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকাসহ ৭জন শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক কঙ্কা দাস ম্যাডামসহ অপর সহকারী শিক্ষকগণের সাথে খানিকটা কথা হয়। এরমধ্যে কিছু কথা হয় স্কুলের প্রাসঙ্গিক উন্নয়ন নিয়ে। স্কুলটি সীতাকুন্ড উপজেলার সদর এলাকায় অবস্থিত। কিন্তু সদর এলকার স্কুল হয়েও সেরকম দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন হয়নি বললেও চলে। দু-তলা একটি ভবন ছাড়া পশ্চিম পাশে আরেকটি দু-কক্ষ বিশিষ্ট একটি একতলা ও লাগোয়া আরেকটি সেমিপাকা ভবন রয়েছে। স্কুলের বাউন্ডারি যা আছে তার মধ্যে সামনের অংশে আংশিক জীর্ণশীর্ণ অবস্থায়। যা নির্মাণকাল থেকে চুনকাম ও রঙ করা বা রক্ষণাবেক্ষণের তাগাদা কেউ অনুভব করেনি। এ প্রসঙ্গে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, এটি ওয়ান পার্সেন্ট এর অর্থায়নে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। এরপর অপর অংশের জন্য আরো চারবার বরাদ্দ আসে, রাজনৈতিক কারণে তা হতে পারেনি। প্রধান শিক্ষিকার এ প্রত্যুত্তর শুনে হতভাগ! কখন কবে অবশিষ্ট বাউন্ডারি জন্য বরাদ্দ আসে; আসলে কেন বা হয়নি, এটিতে কারা বাঁধা দিয়েছিল? তবে স্কুলের বাউন্ডারি বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষাকর্মকর্তা জনাব নুরে ছাফা কাছে একাধিকবার বলা হয়েছিল। তিনি আশ্বস্ত করেন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়েছেন বলে জানান। পরে অনেক আবেদন-নিবেদনে, এবং তড়িঘড়ি করে ওয়ান পার্সেন্টের বরাদ্দ দিয়ে স্থানীয় ইউপি থেকে এ কাজ করিয়ে দেন। এরপর সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাউন্ডারি ও গেইট নির্মাণ কাজের অনিয়ম নিয়ে পত্রপত্রিকায় আরো একাধিকবার উপসম্পাদকীয় লেখতে হয়। তবে বর্তমানের নকশা বা ডিজাইনারের বাউন্ডারি ও গেইট দেখতে দৃষ্টিনন্দন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ সুরক্ষা দিয়ে আসছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ উন্নয়ন বলে দেয় যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ শিক্ষাব্যবস্থা একদফা এগিয়ে আসতে এবং এ উন্নয়ন তার স্বাক্ষ মিলে। অবশ্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি বা নয়-ছয় হয়নি তা নয়। সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট কেএম উচ্চ বিদ্যালয়ের একই কম্পাউন্ডে অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ও গেইট নির্মাণে অপরিপক্বতা বা খামখেয়ালি যে করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, তারও সাক্ষ্য মিলে। স্কুলটির বাউন্ডারি নির্মাণের পাশাপাশি গেইটি এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের চলাচলের কোনো পথ নেই। এটি এখনো দীপ্যমান আছে। বলছিলাম, দোয়াজীপাড়া স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ যে জটিলতা হয়, স্কুলটির নির্মাণের নতুন ভবনের বরাদ্দ এলেও কন্ট্রাক্টরা দরপত্রে অংশ নেননি। রীতিমতো পরপর তৃতীয়বারও প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে কেউ অংশ নেননি। তাতে স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এরমধ্যেই স্কুলের অপর সেমিপাকা ভবনটি পুরোনো হিসাবে টেন্ডার আহবান করা হয় এলজিইডি (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপ্তর) থেকে। দরপত্র বিটকারী আরে কয়েকমাস অপেক্ষা করার পর ভবটি ভেঙে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। এ ঘটনা দৃষ্টিগোচর হলে সঙ্গে সঙ্গে বাধা দিই। এ ক্ষেত্রে বাধা দেয়ার কারণ হলো, পুরানো এ স্কুলটি ভেঙে নিয়ে গেলে, ছাত্র-ছাত্রী খোলা আকাশের নিচে পড়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলীকে ঘটনাটি জানানো হয়। তিনিও ফোন করে বারন করে দেয় ভাঙা বন্ধ রাখতে। একপর্যায়ে দাবির মুখে প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম স্বউদ্যোগে নতুন ভবনটি চতুর্থবার ট্রেন্ডার করার ব্যবস্থা নেন। এতে বলতে হয়, শুধু ট্রেন্ডারের সাথে কন্ট্রাক্টরকেও দরপত্রে বিটে বাধ্য করেন। এভাবে কাজের অগ্রগতিসহ নির্মাণের দেখভাল করতে হয়। তবে কাজের মান ও প্রকৌশলগত বহির্ভূত কার্যক্রমের অপতৎপরও ছিল লক্ষণীয়। যেমন ফাউন্ডেশনের রড মাটির সাথে ঠেস লাগা, চাঁদের রডের ঘনত্বের হ্রাস, অতিরিক্ত বালির মিশ্রণ, উপযুক্ত কিউরেটর করাসহ বহুবিধ সমস্যা পড়তে হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম সাহেবের সহায়তায় ঠিকটাক করা গেছে। অপর কিছু কাজ নিজের অজান্তে বা অপারগতায় ঠেকানো যায়নি। এটাকে বলে মিরাকল! তব্ওু স্কুলের ভবন দাঁড়িয়েছে মাথার ওপর। ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া করার পরিবেশ হয়েছে। এরমধ্যে যেসব বরাদ্দ আসে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সরঞ্জাম- ওই স্থাপনার সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেকটা মন্থরগতি। বলতে গেলে তদারকি নেই। যার ফলে বারবার টিউবওয়েল স্থাপনের পরও যতদ্রুত নষ্ট হওয়া বা চুরি হওয়ার ঘটনাও ঘটতে থাকে অহরহ। এর সাথে দীর্ঘ বছর ধরে প্রধানের টানা অবস্থানের কারণে শক্ত অবস্থান ভেঙে পড়ে। এতে শিক্ষার মান আশানুরূপ হচ্ছে না। এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চলেছে।
৬-১০-২০২৫ ইং দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় আমার অপর একটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশিত। ওই উপসম্পাদকীয়তে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এ মর্মে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চর্চা ক্ষীণ হয়ে আসছে। যেখানে নেই সঙ্গীত চর্চা, নেই শারীরিক পরিচর্যা ও ব্যায়ামগার- প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নেই পাঠাগারসহ দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়ার সুযোগও। এতে করে শিশুশিক্ষার্থীরা পিছনে পড়ে যাচ্ছে মননশীল চর্চা থেকে। একইসঙ্গে পুনরায় দাবি করা হয় সঙ্গিত ও শারীরিক শিক্ষক নিয়োগেও। অথচ রক্ষণশীল দেশ হিসেবে তুরস্ক, মালোশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব এখন এসব বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। তাঁরা আধুনিক ধ্যানধারণায় এগিয়ে আসছে শিক্ষার ক্ষেত্রে। কিন্তু এতদসত্তে¡ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে শিক্ষাবিন্যাস ও পরিবেশগত সচেতন নয়। বিশ্বের আধুনিক দেশগুলো সবচাইতে বেশি জোর দেয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে। যেমনটি শিক্ষার্থীদের শিকার উপকরণসহ স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যসচেতন ও স্বাস্থ্যসম্মত টিফিন ব্যবস্থায়। এসব ক্ষেত্রে দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্র বা সরকার বড়ই উদাসীন। তাহলে আমরা সুনাগরিক আশা করি কি করেই; এরমধ্যে দু-একজন যে কৃতিত্ব দেখাচ্ছে না তাও নয়, যা হচ্ছে একান্ত পারিবারিক শিক্ষা ও সচেতনার সুফল। একইভাবে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে জাতির মেরুদন্ডের কারিগর শিক্ষকগণও। তাঁদের প্রতিও নির্দয় ও বিমাতৃসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। স্কুলটি একাধিক সহকারী শিক্ষকের সাথে কথা বলে এ অভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। অথচ তাঁরা তো আগের মতো পিছিয়ে নেই শিক্ষাদীক্ষায়। এখন যারা নিয়োগ পাচ্ছে, তাঁরা ন্যূনতম স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বেশিরভাগ স্নাতকোত্তর নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এরপরও তাঁদের বেতন স্কেলের দিকটা অনেকাংশে পিছিয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও উদাসীনতার ভাব। মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠে, তাঁরা হয়তো বিষয়টি উপলব্ধি করছেন না, না হয় জেগে-জেগে থেকে ঘুমের ভান করচ্ছেন। না হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১৩ তম গ্রেডে কি করেই হয়? যেখানে সরকারি হাসপাতালের নার্স ও ডিপ্লোমা কৃষি ইঞ্জিনিয়ারগণ ১০ গ্রেডে বেতন স্কেল পেয়ে আসছেন। ১৩তম গ্রেডের বেতন পায় সরকারি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীগণ। তাহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মান-মর্যাদা কোথায় গিয়ে ঠেকছে।
গত ১০ নভেম্বর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ আন্দোলন-কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাঁরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান ধর্মঘট করেন। এ আন্দোলন বিস্তৃতি পেয়ে শাহবাগ এবং শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দিকে ধাবমান-অগ্রগামী হয়। শিক্ষকদের এ আন্দোলন নিয়ে প্রশাসনের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ পরিস্থিতি হয়, এটি দেশবাসীরও দৃষ্টি কাড়ে। অথচ এটি ছিল শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি। তাঁরা বেতন স্কেল ১০ গ্রেড দাবি করে আসছিলেন। এ দাবি নিয়ে শিক্ষকরা কলম বিরতি কর্মসূচিও পালন করেন। আর সেখানে পুলিশ প্রশাসন বাধা দেয় এবং টিয়াসেল, লাঠি চার্জ ও জল কামান নিক্ষেপ করে তাঁদের লাঞ্ছিত করে।
আন্দোলনরত শিক্ষকগণ এসব অশোভনীয় ও অগণতান্ত্রিক আচরণে ক্ষোভপ্রকাশ করেন। তাদের এ দাবির প্রতি কোনপ্রকার ধানাইপানাই চলবে না। তবে সরকারি, আধাসরকারী, স্বায়ত্তশাসিত, এমপিও-ননএমপিও, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কাঠামো ও অবকাঠামোগত বিন্যাসে ব্যাপক ত্রæটি রয়েছে। একইসাথে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে তাঁদের ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। যার ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সুপারসিট দেখা যায়। অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র বেতন স্কেল কাঠামো গঠনের দাবি রাখে।
লেখক : কবি, কলামিস্ট ও গবেষক