একজন ‘ধীরে চলা অথচ পিছু না হটা’ অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব

2

আলমগীর মোহাম্মদ

দুনিয়া খ্যাত আব্রাহাম লিংকনের একটি উক্তি দিয়ে ভাষা সংগ্রামী, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের লড়াকু সৈনিক, সাবেক শিক্ষক, শিক্ষক নেতা এবং সর্বোপরি জননেতা আবদুস সালাম মাস্টারকে স্মরণ করছি। লিংকন বলেছেন, ‘আমি ধীরে চলি। তবে পিছু হটি না। পটিয়া উপজেলার গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম মাস্টারের জীবন ও কর্ম আব্রাহাম লিংকনের উপরেল্লিখিত উক্তির প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে। আবদুস সালাম মাস্টার ছিলেন একজন আদর্শ ইংরেজি শিক্ষক। তিনি নিজে ৫৫ বছর বয়সে বিএড পরীক্ষায় বসেছিলেন এবং সফলতার সাথে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম অবস্থান নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
একজন আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতা, ধৈর্য, সহানুভূতি, যোগাযোগ দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মতো গুণ থাকা উচিত। তাকে অবশ্যই নিজের বিষয়ে অগাধ জ্ঞান থাকতে হবে এবং সহজ ও কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারদর্শী হতে হবে। এছাড়াও, একজন আদর্শ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন, শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন এবং তাদের সমস্যা বুঝতে সাহায্য করেন। ইংরেজি বিষয়ে অসম্ভব পারদর্শী আবদুস সালাম মাস্টারের মধ্যে উপরেল্লিখিত দক্ষতা ও গুণাবলীর সন্নিবেশ ছিলো। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না। শিক্ষকদের নেতাও ছিলেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টানা বারো বছর। তিনি এই সময়ে শিক্ষকদের দাবি দাওয়া আদায় এবং মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আজীবন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ উতসর্গ করা পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র জাতি বাঙ্গালী। বাঙ্গালী জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে সরব ভ‚মিকা পালন করেছিলেন জনাব আবদুস সালাম। বাংলা ভাষার প্রতি অগাধ টান তাঁকে ছাত্রকালে সংগ্রামী হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে। আব্দুস সালাম ছাত্রাবস্থায় লক্ষ্য করেন স্কুল ও কলেজে উর্দু ভাষা শিক্ষার জন্য অযাচিত চাপ দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাঙ্গালি শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি কঠিন ছিলো। এই ঘটনা তাকে ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পটিয়া ও চট্টগ্রাম শহরে মিছিল-সভায় অংশ নেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে আব্দুস সালামের সঙ্গী ছিলেন মফিজুর রহমান সাদা, আহমেদ হোসেন, সরেন্দ্রু পাল ও বজেন্দ্র নাথ শীল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। আব্দুস সালামের নিজ হাতে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে মিছিলে পুলিশের গুলি করার খবর ২২ ফেব্রæয়ারি চট্টগ্রাম এসে পৌছায়। সেদিন পটিয়াসহ পুরো চট্টগ্রামের স্কুল শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভে অংশ নেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের এই সাহস তাঁকে পরবর্তীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা যোগায়।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। ধর্ম-বর্ণ, কিংবা ভৌগোলিক-আদর্শিক অবস্থান নির্বিশেষে, প্রত্যেক নাগরিক যেন তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অধিকার বিনা বাধায় উপভোগ করতে পারে – এই লক্ষ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় সিপিবি পটিয়া উপজেলার নেতৃত্বে থাকা আবদুস সালাম গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রণকারী আবদুস সালাম মাস্টার ছিলেন একজন সত্যিকার অর্থে মানবিক মানুষ। শিক্ষকরা সামনে থেকে সমাজ বদলের নেতৃত্বে দেবেন এমনটাই ছিলেন গত শতাব্দীর বাংলাদেশের লক্ষণীয় চিত্র। ভাষাপ্রেমী সাহসী আবদুস সালাম মাস্টার ছিলেন সেই চিত্রের বাস্তব প্রতিফলন। তিনি ষাটের দশকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সিপিবি পটিয়া উপজেলার নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সিপিবির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় তিনি দলের হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। ১৯৯৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে পটিয়া আসনে কাস্তে মার্কা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন।
১৯৬২ সালে এইচএসসি পাস করে নিজের স্কুল গৈড়লা কেপি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন আবদুস সালাম মাস্টার। শিক্ষকতা করেছেন চার দশকেরও বেশি সময়ে। মহান এই শিক্ষক ও সমাজ বদলের যুদ্ধের অক্লান্ত কর্মী আবদুস সালাম মাস্টারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আবু তৈয়ব লিখেছেনঃ আত্মকেন্দ্রিক ভোগবিলাসী সমাজকে গণমানুষের সমাজরুপে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন আমরা দেখি তা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে নিজেকে উতসর্গ করেছেন আবদুস সালাম মাস্টার। সে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকঅতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব ঘুচাতে শিক্ষক সঙ্গগঠনের নেতৃত্বে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তিনি। তিনি ছাত্রজীবন থেকে প্ররগতিশীল চিন্তার অনুসারী ছিলেন। তিনি ভিন্ন পথ ও মতের সকল মানুষের কাছে গ্রহণো্যােগ্য ছিলেন। শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের জন্য আজীবন কাজ করে যাওয়া আবদুস সালাম মাস্টার পাইরোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সহধর্মিনীও একজন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষাব্রতী এই গুণী দম্পতির পাঁচ সন্তানের সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। শিক্ষকতা ও রাজনীতিসহ সমাজের নানাক্ষেত্রে অবদান রাখছেন তাঁরা।
একজন শিক্ষকের গুণ কী?- প্রশ্নের জবাবে William Arthur Ward বলেন, ‘The mediocre teacher tells. The good teacher explains. The superior teacher demonstrates. The great teacher inspires.’। একজন গুণী শিক্ষক আবদুস সালাম মাস্টার তাঁর শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন। বাংলা একাডেমী পুরস্কার (গবেষণা)প্রাপ্ত সাংবাদিক ও সম্পাদক শামসুল হক তাঁর শিক্ষক আবদুস সালাম মাস্টারকে মূল্যায়ন করে লিখেন, সালাম স্যার আমার শিক্ষক ছিলেন (১৯৭৪)। পরবর্তী সময়ে তিনি সংগঠক ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সম্মানের আসনে আসীন ছিলেন। কলুষতামুক্ত আলোকিত সমাজ গড়তে আবদুস সালাম মাস্টারের মতো মহান মানুষের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানা জরুরি। তাঁর মতো একজন অক্লান্ত সমাজকর্মী ও শিক্ষাব্রতীর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকে আমাদের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক