একইদিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট প্রধান উপদেষ্টার আশাব্যঞ্জক ভাষণ

3

চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন- এমন খবর ছায়ের হওয়ার পর নানারকম গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের কল্পনা ও জল্পনার কোন সীমারেখা নেই। সর্বশেষ সবকিছু মিথ্যা প্রমানিত করে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ভাষণে দেশবাসীকে দারুণ একটি স্বস্তির খবর দিয়েছেন, তা হল আগামী বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং একইদিনে গণভোটও হবে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের আগেই উপদেষ্টার রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও কার্যালয়ে উপদেষ্টামÐলীর সভায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ অনুমোদন লাভ করে এরপর এ সনদে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। উপদেষ্টামন্ডলীর অনুমোদন ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এ সনদ কার্যকর করতে গণসমর্থন আদায়ের উপায় হিসেবে গণভোটের প্রস্তাব করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণভোটের সময় নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ দেখা দেয়। এমনকি কোন কোন দল আন্দোলনে নেমে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কাল বিলম্ব না করে বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সভা আহবান করে তাতে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ঘোষণা করেন।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সরকারের সব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নাও হতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। সরকার নিজস্ব কৌশল ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেবে। এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত করার অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। রাজনৈতিক দলগুলোকে এটা মনে রাখা জরুরি যে দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়াটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের সময় নির্ধারণ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, এর সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ ১৩ নভেম্বর ঢাকায় লকডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে আগুনে ঘি ঢালার উপক্রম করে তুলেছিল। এ রকম একটি কঠিন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও গণভোট নিয়ে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা নিয়ে আর কোন বিবাদ বিসংবাদে জড়ানো রাজনৈতিক দলগুলোর উচিৎ হবেনা বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো এখন থেকে নির্বাচনমুখী হবে এবং প্রচার কার্যক্রম জোরদার করবে। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবতরণার আগেই প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে আবারও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্পষ্ট করেছেন যে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ না থাকলে জাতি মহাবিপদের সম্মুখীন হবে। জাতীয় নিরাপত্তা, ভূরাজনীতির হিসাব, অর্থনীতির সচলতা ও বিনিয়োগের মতো জরুরি প্রশ্নগুলো জড়িত থাকায় নির্ধারিত সময়ে জাতীয় নির্বাচনের আর কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা তাঁর আগের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করায় এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামী বলেছে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজনের ঘোষণা জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, গণদাবি উপেক্ষা করা হয়েছে। আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে।
রাজনৈতিক দলগুলো যাই বলুক, আমরা প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে যে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন তা পুনরায় স্মরণ করে দিতে চাই। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দলগুলো এক্যবদ্ধ না হলে দেশ সামগ্রিকভাবে গভীর সংকটে পড়তে পারে। সেই ক্ষেত্রে বলা যায়, এক ক্রান্তিকাল পার করছে প্রিয় স্বদেশ। এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি পথ দেখাতে পারে। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সবকিছুই নির্বাচনের উপরই নির্ভর করে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই এক্যই হোক একমাত্র প্রত্যাশা।