উপস্থাপনা এখন চ্যালেঞ্জিং এবং সম্ভাবনাময় পেশা

1

মোঃ আসিফ ইকবাল

উপস্থাপনা হল একটি অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র।পরিশুদ্ধ কথন, পরিশুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক শব্দচয়ন, সুন্দর বাচনভঙ্গি, সময়জ্ঞান, তথ্যের অবাধজ্ঞান এবং অপুর্ব শৈল্পিক চিন্তা চেতনায় একজন উপস্থাপক নিজগুণে সুদক্ষ হয়ে উঠতে পারে।বিশেষ করে একজন উপস্থাপক অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু, অতিথি তাদের সংক্ষিপ্ত পদবী এবং অনুষ্ঠানের দর্শকদের মনের সন্তুষ্টি সম্পর্কে সম্যক ধারণ থাকতে। অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ সম্পর্কে একটা ধারাবাহিক মনস্তাত্তি¡ক ধারণা থাকতে হবে। যাতে করে সঠিক সময়ে শুরু এবং শেষ করা যায়। বিশেষ করে দর্শক বিরক্ত হয় এরকম অতিরিক্ত উপমা বা বেশি সময় নিয়ে উপস্থাপকে কোর মত কথা বলা যাবে। অনুষ্ঠানের সূচি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে ১ সপ্তাহ আগে থেকে ধারণা বা চর্চা থাকলে অনুষ্ঠানের দিন ঊপস্থাপনা আরো সহজময় হবে। ইদানিং উপস্থাপনা পেশা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। উপস্থাপনা এখন সৌখিন বিষয়না। এটা এখন শিল্প ও জীবিকা অর্জনের বাহন হিসেবেও পরিগণিত হয়েছে। যে কোন প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কিন্ডার গার্টেন, বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সঙ্গীত, নৃত্য সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন,বণিক সমিতি, শিল্প প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সমিতি, ব্যাংক, বীমা,রাজনৈতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন উপস্থাপকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কর্তৃবরত কেউ কেউ অতিরিক্ত হিসেবে এ বাড়তি দায়িত্ব পালন করে থাকে।আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেশাগত ফ্রিল্যান্স উপস্থাপকরাও চুক্তিভিত্তিক এ দায়িত্ব পালন করে থাকে।সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপস্থাপকের প্রয়োজনীয়তা অনন্যা শিল্পের চেয়েও অনেক অনেক বেশি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অনলাইনের এ যুগে সামাজিক মাধ্যম জনপ্রিয় হওয়ায় উপস্থাপনা পেশার কদর দিন দিন বাড়ছে।একজন উপস্থাপক বহুমাত্রিক জ্ঞান এবং নানা তথ্য সম্পর্কেও অবহিত হতে হয়। সুদক্ষ ও মান সম্পন্ন উপস্থাপক সবসময় কমকথায় অধিকতর সৃজনশীল,যুক্তিনির্ভর,রুচিসম্পন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতে সক্ষম।
আজকাল ৭ বছর থেকে শুরু করে শিশু কিশোর, তরুণ, যুবক এমনকি বয়স্কজনও উপস্থাপনা পেশার জড়িত। অনলাইন মাধ্যম, পেইজবুক এবং কনক্রিয়েট মাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে উপস্থাপনা একটি শৈল্পিক শিল্পময় পেশা হয়ে উঠেছে। আধুনিকতার এ যুগে বিবাহ, মেহেদী, খতনা, আকিকা, বিবাহবার্ষিকী, জন্মবার্ষিকী, প্রতিষ্ঠান, সংস্থার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান, বিদায় বরণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, বনভোজনসহ সর্বক্ষেত্রেই উপস্থাপনা বিষয়টি সার্বিকভাবে প্রয়োজনীয়। তাই এ পেশার মান উন্নয়নে আমাদেরকে আরো যতœবান হতে হবে। অবশ্য উপস্থাপনা, শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক বাচনভঙ্গি, শব্দ প্রয়োগ, ছন্দ বিন্যাসসহ সার্বিক বিষয়াদি নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন ৬ মাস ও ১ বছরব্যাপী সপ্তাহে ১ বা ২ দিন ক্লাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কর্মসুচী দীর্ঘদিন ধরে চলমান রেখে যাচ্ছে।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অনলাইনে এখন এরকম কোর্সসমুহ চলমান রয়েছে। যাতে করে সুদক্ষ ও চৌকস উপস্থাপক ও উপস্থাপিকা সৃষ্টি হয়।বুদ্ধিদীপ্ত উপস্থাপকরা অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্টের লেখা সাথে রাখলেও লেখা দেখে দেখে উপস্থাপনা থেকে বিরত থাকে।অবশ্য উপস্থাপককে অনুষ্ঠানের তথ্য বা স্ক্রিপ্টটাকে আগে থেকে আয়ত্ত বা মুখস্ত করাও বুদ্ধিমানের কাজ।সবকিছুর প্রস্তুতির পরেও একজন উপস্থাপকে লিখিত স্ক্রিপ সাথে রাখা একেবারে বাধ্যতামুলক ভাবতে হবে।কেননা যেকোন সময়ই লিখিত কাগজের প্রয়োজন হতে পারে। উপস্থাপনার বিষয়টা আগের যুগে তেমন বেশি প্রয়োজন না হলেও বর্তমানে উপস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়।একজন যতœবান,চৌকস ও মেধাবী উপস্থাপক অবশ্যই অবশ্যই মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত কথন,চেয়ারে বসা নিয়ে দৃষ্টিকটু কিছু করা,ছবি তোলার জন্য ধাক্কাধাক্কি, কিংবা অতিথি সম্বোধনে অতি তেলমর্দন কিংবা নিজে মাত্রারিক্ত সময় ক্ষেপন কোনমতে করা যাবেনা।বিশেষ করে দর্শকরা যাতে কোনমতে ক্ষেপে কিংবা বিরক্ত বা কটু কথা বলার সুযোগ না পায়।নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার সর্বাতœক চেষ্ঠা করতে হবে। এরপরেও অতিরিক্ত সময় লাগলে তা বুদ্ধিমত্তার সাথে হাসির ছাযাতলে ক্ষমাপ্রার্থনায় দর্শকদের মন শীতল করে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে একটি অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত ও সফলকাম করতে একজন উপস্থাপক অনন্য ভূমিকা পালন করে থাকে।একইসাথে উপস্থাপককে যথেষ্ট উচ্চ শিক্ষা, বহুমুখী জ্ঞান,অনেক শব্দের সাথে পরিচয়,বিভিন্ন ব্যক্তি,বিষয় সম্পন্কে সম্যক জ্ঞান, চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি, বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকের কবিতার লাইন,বাণীসহ চতুর্মুখী অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। বিশেষ করে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সময় অত্যন্ত ঠান্ডা মনষ্কে নিজেকে সামলিয়ে নিতে হবে। যে কোন জটিল পরিস্থিতি সামনে আসুক না কেন কোনরকম উত্তেজনা বা খারাপ ব্যবহার করা যাবেনা। একজন উপস্থাপককে অবশ্যই নিজ দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট পান্ডিত্য হওয়াও জরুরি। উপস্থাপকের বিপরীতে নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ বা নাগরিক সে কথাটিও উপস্থাপকের মনে রাখা জরুরি। মানুষ হিসেবে নিজেকে মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হওয়াও একজন নান্দনিক উপস্থাপকের সুরুচির কাজ বটে। একজন গুণী উপস্থাপক নিজেকে সবসময় শেখার জন্য প্রস্তুতি রাখে। যে কোন অনুষ্ঠানে নিজেকে একজন শিক্ষার্থী মনে করে কিছু শেখার জন্য, বিশেষ করে নানা তথ্য ও নানান অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্ঠা করে। একজন দায়িত্ববান উপস্থাপক মনে রাখতে হবে প্রতিটি অনুষ্ঠানে নিজের ছোট ছোট ভুলগুলো সামনের দিনে অনুষ্ঠানে পরিশুদ্ধ করে নিজেকে আরো বিকশিত করার পথ বিকশিত করতে হবে। বিশেষ করে সিনিয়র বা প্রবীণ উপস্থাপকদ্বয়ের নিকট থেকেও নবীর উপস্থাপকদের অনেক কিছু অনুধাবন করে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। একজন যোগ্য উপস্থাপককে সবসময় মনে রাখতে শেখার কোন শেষ নেই, সবসময় শেখার জন্য প্রস্তুতি থাকতে হবে। মেধাবী, সুজনশীল ও সুদক্ষ উপস্থাপক হয়ে উঠার জন্য একজন উপস্থাপক বা উপস্থাপিকাকে অবশ্যই রুচিশীল আধুনিক পোশাক পরিধানসহ পোশাক বিষয়ে ব্যতিক্রম কিন্তু শালীন পোশাকের উপর নজর রাখতে হবে।আজকের দিনে জনপ্রিয় উপস্থাপক বা উপস্থাপিকাদের যথেষ্ট সুন্দর সাজসজ্জাও করতে হয় অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী। অনুষ্ঠানের ডেকোরেশন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, কিংবা মুল ব্যানারের কালার অনুযায়ী অনুষ্ঠান সময় উপস্থাপক পোশাক নির্বাচন করতে হয়।একজন উপস্থাপন অনুষ্ঠান চাহিদা ধরণ অনুযায়ী আলাদা গ্রীন রুম থেকে কিংবা প্রয়োজনে হ্যান্ড স্পীকার সাহায্যেও হেঁটে হেঁটে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতে পারে। একটি অনুষ্ঠান সার্বিক সুন্দর,পরিপাটি,গোছালো ও সাফল্যময় করে তুলতে উপস্থাপকই ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করে। একজন উপস্থাপক বা উপস্থাপিকাকে সাথে করে প্রয়োজনীয় মেকাপ, সানগ্লাস, নিজের পোশাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম অবশ্যই সাথে রাখতে হয়। সময় সুযোগে একজন উপস্থাপক একাধিক পোশাক পরিবর্তন করেও নিজেকে ভিন্নমাত্রায় তুলে ধরার চেষ্ঠা করতে পারে। এমনকি প্রয়োজনীয় নাস্তা, জল ও টিস্যু সাথে রাখা জরুরি মনে করতে হবে।দীর্ঘ সময়ের প্রোগামে নিজস্ব খাবারই প্রধান ভনসা মনে রাখতে হবে।আর একজন উপস্থাপক বা উপস্থাপককে যে কোন অনুষ্ঠান শুরুর কমপক্ষে ১ ঘন্টা আগে অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সর্বোপরি একজন উপস্থাপক সকল দর্শক তথা মানুষের কাছে অনুকরণীয়,অনুস্মরণীয়, রুচিশীল,স্মার্ট এবং আধুনিক বৃদ্ধিদীপ্ত গুণের মেধাবী এবং দেশপ্রেমিক মানুষ হতে হয়।

লেখক : কবি,প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক