
মো. দিদারুল আলম
প্রকৃতিতে ইতোমধ্যে শীতের আগমনী বার্তা বইতে শুরু করেছে। শীতের আগমনীর সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও সাজে নতুন এক সাজে। অপরূপ এক সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলার প্রকৃতি। শীতের এই অপরূপ সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে দূর-দূরান্ত থেকে উড়ে আসা রঙ-বেরঙের অতিথি পাখি। মূলত শীতপ্রধান দেশ থেকে শীতের তীব্রতা থেকে নিজেদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে এসব পাখি ছুটে আসে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন তুলনামূলক কম শীতের দেশগুলোতে। রঙ-বেরঙের হরেক রকম পাখির পদচারণায় মুখরিত হয় বাংলার গাছপালা, মাঠঘাট, খাল-বিলসহ বিভিন্ন জলাশয়ে। হাজার হাজার মাইল উড়ে আসা এসব পাখিদের মধ্যে নানা রকম প্রজাতি দেখা যায়। অতিথি পাখি হলো পরিযায়ী পাখি যা শীতকালে ঠান্ডা অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে এবং বসন্তকালে ফিরে যায়। এরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের জলাভ‚মি, হাওর, বিল ও চরাঞ্চলে আশ্রয় নেয়। অতিথি পাখিরা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং এদের আগমন প্রকৃতির শোভা ও সৌন্দর্য বাড়ায়। এদের রক্ষা করা এবং এদের আশ্রয়স্থলে বিরক্ত না করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পাখি হলোÑ বালিহাঁস, খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, গিরিয়া, জলপিপি, পানি মুরগি, কমনচিল, বাটনচিল, বুনোহাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, ডুবুরি পাখি, গায়ত রেন পাখি, বাজ সরালি, চাতিকুট, পিনটেইল, নরদাম সুরেলার, লেঞ্জা চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটহাঁস, বৈকাল প্রভৃতি। অতিথি পাখির আগমন প্রকৃতির সৌন্দর্য হাজার গুণ বৃদ্ধি করে দেয়। শীতকালে অতিথি পাখির আগমন প্রকৃতিকে পরিপূর্ণতা দান করে। প্রকৃতি ছেয়ে যায় অনাবিল এক সৌন্দর্যের চাদরে। তবে অতিথি পাখির আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশের একটা শ্রেণির মানুষের লোলুপদৃষ্টি পড়ে অপরূপ সুন্দর পাখিদের দিকে।
এসব পাখি সাইবেরিয়া, উত্তর মেরু, এশিয়া ও ইউরোপের কিছু জায়গা এবং হিমালয়ের আশপাশের স্থানে বসবাস করে। শীতকালে এসব জায়গায় তুষারপাতের কারণে তীব্র খাদ্যসংকটে তাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে এসব পাখি বাংলাদেশসহ বিশ্বের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলগুলোর দিকে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশের সীমানায় ২৮টি মুক্ত অভয়ারণ্য রয়েছে। সাধারণত অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের শুরুর দিকে এসব পাখি আমাদের দেশে আসতে শুরু করে। আমাদের দেশের হাওর-বাঁওড়, মুক্ত জলাশয় ও ঝোপঝাড় এদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। বালিহাঁস, পাতিহাঁস, গাঙচিল, ডাহুক, পানকৌড়িসহ তিন শতাধিক প্রজাতির পাখির আগমন হয়।
প্রতি বছর শীতকাল এলেই দেশের কিছুসংখ্যক অসাধু লোভী মানুষ অতিথি পাখি শিকার করে বিক্রি করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। দূর দেশ থেকে বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটে আসা এসব পাখিকে পরিণত করে মানুষের খাদ্যবস্তুতে। শীতের তীব্রতা থেকে জীবনকে রক্ষা করতে এসে সুন্দর এসব পাখিকে জীবন দিতে হয় গরম বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে, ফাঁদে পড়ে কিংবা জালে আটকা পড়ে। পাখির রমরমা বাজার বসে দেশের বিভিন্ন স্থানে। পাখি আমাদের প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। প্রকৃতির সঙ্গে পাখির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এসব পাখি আমাদের প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আমাদের প্রকৃতির অনেক উপকার সাধন করে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খায় এসব পাখি।
অতিথি পাখি আমাদের জন্য আশির্বাদস্বরুপ। তবুও কিছু অসাধু মানুষের জন্য অতিথি পাখির সংখ্যা দিন দিন কমছে। তারা শুধুমাত্র খাবার জন্য অতিথি পাখিদের শিকার বানাচ্ছে। এদের মাংসকে অনেকে সুস্বাদু বলে মনে করে। এছাড়াও, অনেকেই পাখির পালক সংগ্রহ করে। অতিথি পাখি শিকারের ফলে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অতিথি পাখিরা এখন আর ‘অতিথি’ হয়ে থাকতে পারছে না। পাখি শিকারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ, জাল ও বন্দুক ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও, পরিবেশ দূষণ, জলাভূমি ও বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণেও অতিথি পাখিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
পাখিরা আমাদের পরিবেশের জন্য অপরিহার্য। তারা আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই আমাদের উচিত পাখি রক্ষার জন্য সচেতন হওয়া। পাখি শিকার বন্ধে আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। অতিথি পাখিদের রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। অতিথি পাখি শিকারের বিরুদ্ধে আইন প্রণয়ন করা হযয়েছে। এছাড়াও, বিভিন্ন সংগঠন অতিথি পাখি রক্ষায় কাজ করছে। এই পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। অতিথি পাখি রক্ষার জন্য আমাদের জনমত গড়ে তুলতে হবে। অতিথি পাখির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে হবে। অতিথি পাখির গুরুত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে।
শীত শেষে এরা আবার অতিথির মতো চলে গেলেও এই ক্ষণিকের অতিথিদের সঙ্গে আমরা অতিথিসুলভ আচরণ করি না। হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসব পাখি আমাদের কাছে বেঁচে থাকার তাগিদে এলেও আমরা তাদের শিকাওে প্রয়োগ করি বিভিন্ন কৌশল। বড়শি ফেলে, ফাঁদ পেতে, বন্দুকের সাহায্যে, চোখে লেজার রশ্মি ফেলে প্রায়ই এসব পাখি শিকার করা হয়। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি অনবরত এসব পাখি শিকার করে যাচ্ছে। তা ছাড়া বাজারেও এসব পাখির বেশ দাম রয়েছে। তাই বিক্রি করতেও খুব একটা বেগ পেতে হয় না। চট্টগ্রাম বিভাগের চর বারী, বাটা চর, গাউসিয়ার চর, মৌলভীর চর, মুহুরী ড্যাম, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, পতেঙ্গা সৈকত, সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপ; সিলেট বিভাগের আইলার বিল, ছাতিধরা বিল, হাইল হাওর বাইক্কা, হাকালুকি হাওর, পানা বিল, রোয়া বিল, শনির বিল ও টাঙ্গুয়ার হাওর। শীত এলেই এসব জলাশয়সহ বিভিন্ন হাওর, বাঁওড়, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানান রং-বেরংয়ের নাম জানা, অজানা পাখির। এদের আমরা অতিখি পাখি বলে থাকি। অখচ বেআইনি ক্ষুদ্র আনন্দের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয় অতিথি পাখিগুলোর!
অনবরত পাখি শিকারের কারণে দিন দিন এসব পাখির আগমন ও সংখ্যা আমাদের দেশে কমে যাচ্ছে, এদের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। নির্বিচার পাখি শিকারের কারণে এদের প্রায় ১৩০টি প্রজাতি প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পাখি শিকারে একদিকে যেমন জীববৈত্র্যি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে পোকার আক্রমণ বেড়েই চলেছে। পাখি শিকার দন্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণি রক্ষা আইন ও ২০১২ সালে বন্যপ্রণি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দন্ডের বিধান রয়েছে। এতে বলা আছে, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি একবছর জেল, এক লাখ টাকা দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার শাস্তি রয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় কেউ করলে শাস্তি ও জরিমানা দ্বিগুণ হবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি যদি অতিথি পাখির মাংস ও দেহের অংশ সংগ্রহ করে দখলে রাখে কিংবা বেচাকেনা করে তাহলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড এবং ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে
পাখি প্রকৃতির অলংকার। অতিথি পাখি একদিকে যেমন আমাদেও দেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে, ঠিক তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অভাবনীয় অবদান রাখছে। আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে বাংলাদেশে পাখির সংখ্যা প্রয় ৬৫০ প্রজাতির। এর মধ্যে ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী। সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২৯০টি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়। আন্তর্জাতিকভাবে জলচর পাখির জন্য স্বীকৃত ২৮টি জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে। এগুলো হলো- বরিশাল বিভাগের চর বারি, চর বাঙ্গের, কালকিনির চর, চর শাহজালাল, টাগরার চর, ডবা চর, গাগোরিয়া চর, চর গাজীপুর, কালুপুর চর, চর মনপুরা, পাতার চর ও উড়ির চর।
পাখি প্রকৃতির অলঙ্কার। অতিথি পাখি আমাদের উপকারী বন্ধু। বিশেষ করে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এসব পাখির বড় ভূমিকা রয়েছে। অতিথি পাখিরা আমাদেও দেশে এসে প্রকৃতির সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। অতিথি পাখিদের প্রতি আমাদের যতœশীল হতে হবে। অতিথি পাখি ফসল ও শাকসবজির ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে পাশাপাশি ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অতিথি পাখির ভূমিকা অপরিসীম।
প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় অতিথি পাখি শিকার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক










