ঈদুল আজহা ও প্রাসঙ্গিক কথন

2

এমরান চৌধুরী

মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আল্লাহ-প্রেম ও পিতৃস্নেহের কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক আল্লাহর নবীর সুমহান আত্মত্যাগের মহাস্মারকরূপে পালিত হয় এ দিনটি। প্রতি বছর জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে সারা মুসলিম বিশ্বে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আজহা।
ঈদ শব্দের অর্থ হল খুশি-আনন্দ। আর আজহা শব্দের অর্থ হল কুরবানির দিন। আরবি ‘করব’ ধাতু থেকে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি। এর আভিধানিক অর্থ নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভ। মহান রাব্বুল আলামিনের অনন্ত সান্নিধ্যের জন্য আত্মোৎসর্গ করাই হল কোরবানির মূল উদ্দেশ্য।
আল্লাহর সৃষ্ট সমস্ত জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব। আশরাফুল মাখলুকাত। কিন্তু মানুষ সেরা জীব হলেও তারাই আবার নানা সময় নানা প্রলোভন, প্ররোচনা বা অসৎসঙ্গে পড়ে আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত হয় এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়। তাই আল্লাহপাক মানুষকে সৎ পথের নির্দেশনা দিতে, সৎ পথে চলার আহŸান জানাতে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন নবী ও রাসূল।
এই নবী ও রাসূলদের একজন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। এক অন্ধকার যুগে আল্লাহপাক তাঁকে প্রেরণ করেন মানুষকে ভালো কাজের পরামর্শ ও মন্দ কাজে নিষেধ করতে। আল্লাহ পাক প্রায়ই তাঁর প্রিয় বান্দাদের ঈমানের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এমনই এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখিন হয়েছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.)। দৃঢ়তা ও আল্লাহর উপর অবিচল আস্থায় পৃথিবীর ইতিহাসে অদ্বিতীয় এই কঠিন পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে যান তিনি। তাঁর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সময়টিকে দুনিয়ার বুকে অবিষ্মরণীয় করে রাখতে তাঁর অনুগত বান্দাদের প্রতি কোরবানি করার আদেশ দেওয়া হয়। এই যে কোরবানির কথা বলা হলো সে আদেশ আমাদের কাছে কীভাবে এল তা অবশ্যই আমাদের সকলের জানা দরকার।
একদিন হযরত ইব্রাহিম (আ.) ঘুমিয়ে আছেন। তখন গভীর রাত। হঠাৎ তিনি স্বপ্ন দেখলেন। স্বপ্নে তাঁকে বলা হলো তাঁর প্রিয় বস্তুকে কুরবানি দিতে। ভোরে উঠে তিনি আল্লাহ পাকের নামে উট আর দুম্বা কোরবানি করলেন। তারপরের রাতে তিনি আবার একই রকম স্বপ্ন দেখতে পেলেন। পরের দিন ভোরে তিনি আরও বেশি উট আর দুম্বা কোরবানি করলেন। তৃতীয় রাতে তিনি আবার স্বপ্ন দেখলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় রাতের স্বপ্ন থেকে তৃতীয় রাতের স্বপ্নে একটা সুনির্দিষ্ট বিষয়কে ইঙ্গিত করা হলো। বলা হলো, ‘হে ইব্রাহিম, তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি করো।’
তৃতীয় রাতের স্বপ্নের পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) পড়লেন মহাভাবনায়। একজন নবীর কাছে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়বস্তু কী! ধন, দৌলত, ঐশ্বর্য। নিশ্চয় নয়। আল্লাহ-প্রেমে পাগল নবী বুঝতে পারলেন আল্লাহ নিশ্চয় তাঁর কলিজার টুকরো, নয়নের মনি কিশোর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে কুরবানি করার কথা বলছেন। এতটুকু বিচলিত বা চিন্তিত না হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্রকে জানালেন তা। আল্লাহপাকের অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরে নেকবান পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) হাসি মুখে তাতে সম্মতি দিলেন। আর মা হাজেরা (রা.)ও সানন্দে গর্ভের ধনকে উৎসর্গে রাজি হলেন।
যথাসময়ে পিতা-পুত্র মিনার এক উন্মুক্ত ময়দানে হাজির হলেন। পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর হাতে চকচকে এক ক্ষুরধার ছুরি। তিনি ইসমাইল (আ.) এর চোখ বেঁধে মাটিতে শুইয়ে দিলেন। তারপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইসমাইল (আ.) এর গলায় ছুরি চালানো শুরু করলেন। তখনই ঘটে গেল এক বিষ্ময়কর ঘটনা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যখন পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছেন তখনই আল্লাহর হুকমে হযরত জিব্রাইল (আ.) বেহেশত থেকে একটি দুম্বা নিয়ে আসলেন। হযরত ইসমাইল (আ.) এর পরিবর্তে আল্লাহপাকের প্রেরিত দুম্বা কোরবানি হয়ে গেল। এভাবে আল্লাহ পাক হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পরীক্ষা পাসের নেয়ামত দান করেন এবং পরবর্তী বংশধরদের তদ্রুপ পশু কোরবানির বিনিময়ে আত্মত্যাগের নিদর্শন রক্ষা করতে নির্দেশ দেন। এ ঘটনার পর থেকে সারা মুসলিম দুনিয়ায় সামর্থবান ব্যক্তিদের উপর কুরবানি করার কথা বলা হয়েছে। তারই সূত্র ধরে আজ পর্যন্ত যে অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে, তাই কোরবানি।
ঈদুল আজহার দিন নিছক কোন অনুষ্ঠানের নাম নয়, এটি একটি পবিত্র ইবাদত। নামাজ যেমন আল্লাহ ছাড়া আর কারো উদ্দেশ্যে পড়া যেতে পারে না, অনুরূপ কোরবানি ও এক আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ছাড়া অন্য কারো জন্য করা যেতে পারে না। ইসলামি শরিয়তে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন নামে পশু জবাই করলে তা কুফর ও শিরকের অন্তর্ভূক্ত হয়। দশই জিলহজ ঈদুল আজহার দুই রাকাআত ওয়াজিব নামায শেষে কোরবানি করা সামর্থবান নারী-পুরুষের একান্ত কর্তব্য। তবে খেয়াল রাখতে হবে কোরবানি যেন লোক দেখানো কিংবা গোশত খাওয়ার জন্য না হয়। ছাগল, ভেড়া, গরু, মহিষ, দুম্বা বা উট কোরবানি করা যায়। বন্যপ্রাণী হরিণ বা অন্য কোন দামি প্রাণী কোরবানি করা জায়েজ নেই। নিখুঁত প্রাণী কুরবানি করা প্রধান শর্ত। ছাগল, দুম্বা, ভেড়া একজনে, গরু, মহিষ বা উট সাতজনে পর্যন্ত কুরবানি করতে পারে। কুরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ ফকির, মিসকিন, একভাগ আত্মীয়-স্বজন এবং একভাগ নিজের জন্য রাখা মুস্তাহাব।
কোরবানির সঙ্গে নিহিত আছে আল্লাহ পাকের প্রতি আমাদের ভালবাসা, আনুগত্য, নৈকট্য ও আত্মত্যাগের নিদর্শন। তাই কোরবানি করতে গিয়ে কোরবানি যথাযথ নিয়মেই করতে হবে। বড় দেখে গরু কিনে হকদারকে নির্দেশিত নিয়মে কোরবানির গোশত বণ্টন না করলে তা হবে নিছক গোশত খাওয়া, কোরবানি হবে না। আমাদের সমাজে বিশেষ করে নাগরিক জীবনে অনেক মানুষ দেখা যায় কোরবানি করার পর দ্রæত ড্রিপ ফ্রিজে গোশত রেখে কেউ মোবাইল নিয়ে কেউ টিভি নিয়ে বসে যান। ফকির মিসকিনদের দূরের কথা নিজের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনদের কথাও বিলকুল ভুলে যান। এরূপ কোরবানি আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হবে কি না একমাত্র আল্লাহ পাকই ভালো জানেন। ভুলে গেলে চলবে না, আপনার জবাইকৃত গরুতে আপনার জন্য বরাদ্দ তিন ভাগের এক ভাগ। বাকি দুভাগ আপনার জন্য নয়। সুতরাং এই দুভাগ গোশত হকদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া আপনার প্রধানতম কর্তব্য। এই কর্তব্য যথাযথ পালনের মধ্যেই কোরবানির পরিপূর্ণতা নিহিত। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে যথাযথ কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক