ঈদগাঁওয়ে মাঠে দেখা নেই লবণচাষীদের

2

সেলিম উদ্দিন, ঈদগাঁও

কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার উপকূলীয় ইউনিয়ন পোকখালী-ইসলামপুরে লবণ উৎপাদনের মৌসুম শুরু হলেও মাঠে দেখা নেই চাষীদের। এখনও প্রস্তুত হয়নি লবণ মাঠ, গর্তে পড়ে আছে শত শত মণ লবণ। তবে চাষীদের দাবি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লবণ মাঠে নামবেন না তারা। বিসিকের আশা, শিগগিরই লবণ উৎপাদনে মাঠে নামবেন চাষীরা। আর লবণের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব।
উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের গোমাতলী এলাকা। গত বছর এই সময় মাঠে লবণ উৎপাদনের ব্যস্ত ছিল চাষীরা আর এ বছর লবণ উৎপাদন তো দূরে থাক, এখনও মাঠ প্রস্তুত কিংবা মাঠেই নামেনি তারা।
কক্সবাজার বিসিক জানায়, শীতকালকে ঘিরে শুরু হয় দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। যা চলে নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত। এই সময়ে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ মাঠ তৈরি থেকে শুরু করে উত্তোলন হয় সমুদ্রের নোনা পানি শুকানোকে কেন্দ্র করে।
উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের মালমুরাপাড়ার লবণচাষী মো. আলম। গত বছর ৩ একর জমিতে লবণ চাষ করে উৎপাদন করে সাড়ে ১২শ মণ লবণ। কিন্তু লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গুনতে হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকার লোকসান। তিনি বলেন, ‘মাঠে প্রতি মণ লবণ উৎপাদন করতে খরচ হয় ৪শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ টাকা। কিন্তু বিক্রি করে পেয়েছি ২০০ টাকা। যার কারণে গত বছর সাড়ে ৩ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এত টাকা লোকসান দেয়ার পর কীভাবে মাঠে নামব?’
শুধু মো. আলম নন; এখনও লবণ মাঠে নামেনি উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের বৃহত্তর গোমাতলী, ইসলামপুর ইউনিয়নের খাঁনঘোনা, কৈলাসেরঘোনা, সাদাঘোনার চাষীরা। তাদের দাবি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং জমির লিজ মূল্য না কমালে মাঠে নামবেন না তারা।
লবণ চাষী ইসলাম বলেন, ‘গত দুই বছরের প্রায় এক হাজার মণ লবণ এখনও মাঠে গর্তে পড়ে রয়েছে। কারণ লবণের দাম না পেয়ে এ অবস্থা। যদি প্রতি মণ লবণ সাড়ে ৪শ’ টাকা থেকে ৫শ’ টাকা বিক্রি করে পাওয়া যায়, তাহলে চাষি বেঁচে থাকবে। কিন্তু গত দুই বছর ধরে তো লবণের মূল্য পাচ্ছি ২০০ টাকা। তাহলে কীভাবে আমাদের সংসার চলবে। লোকসান দিতে দিতে আর মাঠে নামতে ইচ্ছে করছে না।’
আরেক চাষী আহমদ কবির বলেন, ‘প্রচন্ড রোদের মাঝে মাঠে পরিশ্রম করে লবণ উৎপাদন করি ৬ মাস। আর বাকি ৬ মাস কোনো আয় থাকে না। কিন্তু বন্ধের সময় জেলেও চালসহ আর্থিক সহায়তা পায়। সেক্ষেত্রে আমরা লবণ চাষীরা কোনো ধরনের সরকারের পক্ষ থেকে চাল কিংবা আর্থিক সহায়তা পায় না। তার ওপর লবণের ন্যায্যমূল্য মিলছে না।’
উপজেলার ইসলামপুর এলাকার লবণ চাষী জাগির হোসেন বলেন, ‘লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লবণ মাঠে নামব না। আর লোকসান সইতে পারছি না। সরকার তো ধান-চাল মাঠ পর্যায় থেকে ন্যায্যমূল্য ক্রয় করে। কিন্তু লবণ কেন ন্যায্যমূল্য চাষীদের কাছ থেকে ক্রয় করতে পারে না। লবণ চাষীরা কেন এতো অবহেলিত?’
ঈদগাঁও উপজেলা লবণচাষী ও ব্যবসায়ী সংগ্রাম পরিষদের হান্নান মিয়া বলেন, জেলায় প্রায় ৪১ হাজারের বেশি লবণচাষী রয়েছে। কিন্তু চলতি মৌসুম পহেলা নভেম্বর থেকে শুরু হলেও এখনও মাঠে নেমেছে মাত্র কুতুবদিয়া ও ছনুয়ার কয়েক হাজার চাষী। কিন্তু প্রায় ৩৯ হাজার লবণচাষী এখনও মাঠে নামেনি। কারণ হিসেবে উঠে আসছে বাজারে প্রচারিত প্রচুর পরিমাণ শিল্প লবণ আমদানি হয়েছে, মিল মালিক সিন্ডিকেটের কারণে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না, অন্যদিকে জমির লিজ মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি বেশি এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। এসব সমস্যা নিরসনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। যদি মাঠ পর্যায়ে চাষীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয় তাহলে চাষীরা মাঠ নামতে সবসময় প্রস্তুত।’
কক্সবাজার বিসিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, লবণ মৌসুম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকায় অনেক চাষী মাঠে নেমেছেন। অন্যান্য এলাকাতেও শিগগিরই চাষীরা মাঠে নামবেন বলে তিনি আশা করেন।
গত ৯-১১ নভেম্বর বিসিক চেয়ারম্যান কক্সবাজার সফর করে লবণ মাঠ পরিদর্শন করেন এবং চাষীদের সঙ্গে কথা বলেন। চাষিদের উৎসাহিত করতেই তার এই সফর।
উপ-মহাব্যবস্থাপক আরও জানান, যেসব এলাকায় চাষীরা এখনও মাঠে নামেননি, তারা দ্রæত মাঠে নামবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আর এক সপ্তাহ পর বাঁশখালীর ছনুয়া এবং কুতুবদিয়া থেকে নতুন লবণ পাওয়া যাবে।
উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, এখনও মাঠে গতবছরের ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন লবণ মাঠে মজুত রয়েছে। আর লবণ আমদানি বিষয়ে সরকার এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি।
উল্লেখ্য, গত বছর ৬৯ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজারের বেশি চাষী লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত ছিল। আর চলতি বছর লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।­