ইসলামে তাসাউফ ও মোরাকাবার গুরুত্ব

2

শাহ্ ফাইজুল কাবির বদরী

ইসলাম কেবল বাহ্যিক আমল বা আচার-অনুষ্ঠানের ধর্ম নয়; এটি আত্মার শুদ্ধি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার এক অনন্য জীবনব্যবস্থা। বাহ্যিক শরীয়তের পাশাপাশি ইসলাম অন্তরের জগৎকেও গুরুত্ব দিয়েছে, যাতে মানুষ নিজেকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে।
তাসাউফ হলো ইসলামের সেই আধ্যাত্মিক দিক, যার লক্ষ্য- অন্তরের পরিশুদ্ধি, নফসকে দমন ও আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন। আর মোরাকাবা হলো তাসাউফের এক বিশেষ অনুশীলন, যার অর্থ- এমন অন্তর্জাগতিক সচেতনতা অর্জন করা যেন মানুষ সর্বদা অনুভব করে, আল্লাহ তাকে দেখছেন।
তাসাউফের ভিত্তি কুরআনে : কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বারবার আত্মার পরিশুদ্ধি, নফসের সংযম ও আল্লাহমুখী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। ‘নিশ্চয়ই সফল হলো সে ব্যক্তি, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সূরা আশ-শামস, ৯১:৯) এই আয়াত স্পষ্ট করে বলে- প্রকৃত সাফল্য বাহ্যিক পদ বা সম্পদে নয়, বরং আত্মার পরিশুদ্ধিতে নিহিত। আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন- ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সূরা আত-তাওবা, ৯:১১৯) এখানে ‘সাদিকীন’ বলতে বোঝানো হয়েছে— আল্লাহপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, আখলাকে পরিশুদ্ধ, অন্তরজগতে স্বচ্ছ ও ঈমানদার ব্যক্তিদের। এদের সঙ্গ গ্রহণ করাই তাসাউফের মূল পথ।

হাদীসের আলোকে তাসাউফ : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— ‘সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)। তাসাউফের মূল শিক্ষাই হলো নিয়তকে পরিশুদ্ধ রাখা, আমলকে খালিস করা এবং রিয়া বা ভন্ডা মি থেকে আত্মাকে মুক্ত করা। আরেক হাদীসে রাসূল (দ) বলেন- ‘শরীরে এমন একটি অঙ্গ আছে, যদি তা শুদ্ধ হয় তবে পুরো শরীর শুদ্ধ হয়, আর যদি তা দূষিত হয় তবে পুরো শরীর দূষিত হয়- সেটি হলো হৃদয়।’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
এই হাদীস প্রমাণ করে, ইসলামে আত্মার ও হৃদয়ের শুদ্ধিই আসল বিষয়। আর সেই আত্মিক পরিশুদ্ধিরই নাম তাসাউফ।

মোরাকাবার গুরুত্ব : মোরাকাবা হলো এমন এক অবস্থান, যেখানে মুমিনের অন্তরে সর্বদা জেগে থাকে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষণকারী।’ (সূরা আন-নিসা, ৪:১) অর্থাৎ, আল্লাহ সর্বদা আমাদের দেখছেন- এ বিশ্বাসে জীবনযাপন করাই মোরাকাবার সারমর্ম।
রাসূলুল্লাহ (দ) ইহসানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন- ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ; আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত মনে রেখো-তিনি তোমাকে দেখছেন।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮)
এ হাদীসই মোরাকাবার মূল ভিত্তি, যেখানে মানুষ প্রতিটি কর্মে আল্লাহর দৃষ্টি অনুভব করে। তাসাউফ ও মোরাকাবা ইসলামের বাহিরের কোনো দর্শন নয়; বরং এটি ইসলামের হৃদয় ও আত্মা। শরীয়ত হলো ইসলামের বাহ্যিক দেহ, আর তাসাউফ হলো সেই দেহের প্রাণ। যখন বাহ্যিক আমল (শরীয়ত) ও অন্তরের পরিশুদ্ধি (তাসাউফ) একত্রিত হয়, তখনই মানুষ সত্যিকারের ‘মুত্তাকি’ ও ‘মুহসিন’ হয়ে ওঠে।
আজকের বস্তুবাদী যুগে, যখন মানুষের অন্তরে শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে, তখন তাসাউফ ও মোরাকাবা-ই হতে পারে আত্মিক প্রশান্তি ও সমাজের নৈতিক জাগরণের পথপ্রদর্শক। তাসাউফ মানে হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে অন্তরকে এমনভাবে নির্মল করা, যেন সে আল্লাহর নূরের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
লেখক : সাজ্জাদানশীন, মানযারে আউলিয়া দরবার শরীফ। খতিব, শাহ্ আমানত হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ বাকলিয়া, চট্টগ্রাম