ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ

158

পৃথিবীর কোন ধর্মমতের নাম শান্তি নেই, ইসলাম অর্থ শান্তি। মুসলিম অর্থ শান্তিকামী। যারা শান্তিতে নেই তারা ইসলামে নেই। মহান আল্লাহ পাকের একটি নাম ‘সালাম’ অর্থ শান্তি, মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয় শান্তির অগ্রদূত। তিনি মদিনার যে পবিত্র ভূমিতে শুয়ে আছেন তার একটি নাম ‘দারুস সালাম’ বা শান্তির ঘর, সে শান্তির ঘরেও জঙ্গিরা এখন হামলা করে। তিনি পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য হিলফুল ফুজুল নামে সংগঠন করেছিলেন। আজ জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীরা কী ইসলামের শান্তির আদর্শে বিশ্বাস করেন?
প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের বাণী নিয়ে কোন দূতকে যখন অমুসলিম রাষ্ট্র প্রধানের নিকট প্রেরণ করতেন তখন সে দূত গিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে বলতেন, ‘সল্লিম, তাসলিম’ অর্থাৎ শান্তিতে আস, শান্তিতে থাক।
ইসলামের পরিভাষার মূল শব্দ ‘সিলমুন’ বা ‘সীন’ ‘লাম’ ‘মিম’। ‘সিন’ দ্বারা-সালামত অর্থ-সুস্থতা, ‘লাম’ দ্বারা-লিনাত অর্থ-নম্রতা, ভদ্রতা, ‘মীম’ দ্বারা-মহব্বত অর্থ-ভালোবাসা বুঝায়। আমাদের আত্মস্থ হয় যে, ইসলাম নামের মধ্যেই নিহিত আছে শান্তি, স্বস্তি, সুস্থতা, ভদ্রতা, ভালোবাসার মত মানবিকগুণ এ নামের মধ্যে নিহিত আছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন, ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ বা মহাবিশ্বের (সর্ব ধর্মের মানুষ ও সকল সৃষ্টির) জন্য রহমত স্বরূপ। (সূরা: আম্বিয়া, আয়াত:১০৭)
এই মহান শান্তির ধর্মকে ব্যবহার করে জঙ্গিরা দেশকে আইয়ামে জাহেলিয়াতের দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। অথচ প্রিয় নবী হযরত মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজকে আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মুসলমান কে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আল মুসলেমু মান সালামান মুসলেমুনা মিন লিসানিহি ওয়া ইয়াদিহ্’ি অর্থাৎ মুসলমান সে ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। (বোখারী ও মুসলিম শরীফ)
এই হাসিদ দ্বারা বুঝা যায় এক মুসলমান অপর মুসলমানের নিরাপত্তা দেওয়া ঈমানী দায়িত্ব। পৃথিবীর মধ্যে এক ইহুদী আরেক ইহুদীকে ধর্মের নামে হত্যা করেনা, এক খ্রীস্টান আরেক খ্রীস্টানকে ধর্মের নামে হত্যা করেনা, এক হিন্দু আরেক হিন্দুকে ধর্মের নামে হত্যা করেনা, এক বৌদ্ধ আরেক বৌদ্ধকে ধর্মের নামে হত্যা করেনা কিন্তু আফগানিস্তান-পাকিস্তান এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে ধর্মের নামে হত্যা করে। যে হত্যা করছে তার ধর্ম ইসলাম, গ্রন্থ আল কোরআন, নবী হযরত মোহম্মদ (দ.), সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ এবং যাকে হত্যা করেছে তাঁর ধর্ম, গ্রন্থ, নবী ও সৃষ্টিকর্তা একই। পাকিস্তানের লাল মসজিদ আজ এক মুসলমানের হাতে আরেক মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। জঙ্গিবাদের কারণে সে দেশের ২শ’ মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। আইএস হত্যা করে ইসলামের নামে আরেক মুসলমানকে। এসব মুসলমানগণ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত নন, তারা জানে না কী কারণে কাদের ইঙ্গিতে এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে হত্যার উৎসবে মেতে উঠেছে। যাদের কাছে মুসলমান ভাই নিরাপদ নয় তাদের হাতে দেশ ধর্ম নিরাপদ থাকবে কী ভাবে ? মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী ধ্বংস হবে না, যতক্ষণ না এমন পরিস্থিতি হবে যে হত্যাকারী নিজেও জানবে না, কেন সে লোকটিকে হত্যা করল আর নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে কেন তাকে হত্যা করা হলো। (মুসলিম শরীফ, হাদিস নং ২৯০৮)
ইসলামের আদর্শের জন্য নয়, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে জঙ্গিরা ব্যবহৃত হচ্ছে কিন্তু তা তারা জানে না এবং যারা নিহত হচ্ছে তারাও জানে না কী কারণে নিহত হলো। আইএস মনে করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ হত্যা করছে, অথচ আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে বলেছেন, আইএস’র স্রষ্টা বারাক ওবামা ও হিলারী ক্লিনটন। এ বিষয়ে আর কিছু স্পষ্ট করে বলার দরকার নেই।
মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘এবং তারা দুনিয়াতে ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায় আর আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করে তা’ (সূরা আল মাদিয়া :আয়াত৬৪)
আসমানের পবিত্র ফেরেস্তাগণও হত্যাকান্ডকে চরমভাবে ঘৃণা করেন। মহান আল্লাহ পাক আদম(আ.) কে সৃষ্টির লক্ষ্যে যখন ফেরেস্তাদের মতামত চান, তখন ফেরেস্তাগণ বললেন, আপনি কি পৃথিবীতে এমন আদম সৃষ্টি করবেন। যে সংঘাত ও রক্তপাত করবে? (সূরা: বাকারা:৩০)
এতে আত্মস্থ হয় যে, জমিনের আদম সন্তান নয়, আসমানের ফেরেস্তাগণও খুন খারাবিকে ঘৃণা করেন।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে কাফিরগণ রাত-দিন গালি দিত, যারা তাঁর বিরুদ্দে প্রকাশ্যে অস্ত্র ধারণ করেছিল, অনেক সাহাবায়ে কেরামকে শহীদ করেছিল সেসব কাফির বদর যুদ্ধে বন্ধি হলে তিনি কাউকে হত্যা বা আঘাত করেননি। তাদের সাথে যে ধরনের আচরণ করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এসব কাফিরগণ মক্কায় ফিরে বলেছিলেন, ‘মদিনাবাসীরা (মুসলমানরা) সুখে থাক, তাঁরা নিজেরা পায়ে হেঁটে আমাদের উটে চড়তে দিয়েছে, আটা যখন ফুরিয়ে আসে তখন তারা খেজুর খেয়েছেন আর আমাদের রুটি খেতে দিয়েছেন।
অথচ এই মহান পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে জঙ্গিবাদীরা মহান আল্লাহ পাকের সৃষ্টির সেরা জীব ‘আশরাফুল মাখলুকাত’কে হত্যা করছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন, ‘ওয়ালাকাদ কাররামনা বানি আদামা’। অর্থাৎ আমি মানব জাতিকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছি। জঙ্গিবাদীরা এই মর্যাদাবান মানব জাতি হত্যার উৎসবে নিয়োজিত হয়েছে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে পবিত্র শব্দ হচ্ছে ‘ধর্ম’ অথচ ধর্মকে নিয়ে সবচেয়ে বেশী অধর্মের কাজ করেছে ভÐরা। জঙ্গিবাদ সমূলে উৎখাত করতে পারলে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ভাবে শন্তিশালী হয়। জঙ্গিরা আফগানিস্তানকে ধ্বংস করেছে, ইরাক, সিরিয়া, পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে, বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি অর্থনৈতিকভাবে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে ছিল না অথচ আজ অনেক পিছিয়ে পড়েছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কারণে। মুসলিম বিশ্বের একটি রাষ্ট্রই পারমাণবিক বোমার অধিকারী, তা হনে পাকিস্তান। রূপকার হলো বিজ্ঞাণি আবদুল কাদির। তিনি বিশ্বের দরবারে একজন শ্রেষ্ঠ অপরাধী। অপরাধের কারণে তাঁর পাকিস্তান জঙ্গিরাষ্ট্র কারাগারে ঢুকিয়ে দিয়েছে আর ভারতে যিনি শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী তিনিও মুসলমান। নাম আবদুল কালাম। তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের রাষ্ট্র ভারতের সর্বোচ্চ স্থান মহামান্য রাষ্ট্রপতির আসনে বসিয়েছেন, সম্মানিত করেছেন। জঙ্গিবাদ মানে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে পশ্চাতে যাওয়া, অন্ধকারে যাওয়া, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া।
কারবালার হত্যাকাÐ ইসলামের ইতিহাসের জঘন্য হত্যাকাÐ। জঙ্গিদের হাতে প্রতিদিন যত মুসলমান হত্যা হচ্ছে এত মুসলমান কারবালার প্রান্তে শহীদ হননি। প্রতিদিন মুসলমানদের জন্য আজ কারবালার ট্রাজেডি।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের মত কাজ করতো কিছু লোক কিন্তু তারা ছিল মোনাফিক। এরাই ইসলামের চার খলিফা (খোলাফায়ে রাশেদীন)’র তিন খলিফাকে শহীদ করে। এই নামধারী মুসলমানরাই ইমাম হোসাইন (রা.), হাসান (রা.) এবং কারবালার প্রান্তরে ৭২জন আওয়াদে রাসুলকে শহীদ করে। আজ একুশ শতকে এসে এই নামধারী মুসলমান ইসলামের নামে হত্যা উৎসবে মিলিত হয়েছে। এরা ধর্মের কলংক, ইহুদীর দালাল। এদের প্রতিরোধ করা প্রত্যেক মুসলমানদের কর্তব্য।
মুসলমানগণ যদি জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে অমুসলিমগণকে হত্যা করে তাহলে খ্রীষ্টান, হিন্দু, ইহুদী, বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও তাদের ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ সৃষ্টি হতে পারে। এভাবে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করতে থাকলে একদিন পৃথিবী নামক গ্রহটি মানবশুন্য হয়ে যাবে। তাই মহানবী (দ.) বিদায় বেলায় বিদায় হজ্বের ভাষণে ঘোষণা করেছেন, ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করিও না। অতীতে বহু জাতি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে‘।
আমাদের মনে রাখা উচিৎ বাংলাদেশ মানে সমগ্র পৃথিবী নয়, এদেশে যা কিছু ঘটবে তার প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী হবে। আধুনিক বিশ্বের জনপ্রিয় স্লোগান ‘গ্লোবাল ভ্যালেজ’ বা বিশ্ব পল্লী। সারা জগৎ যেন একটি গ্রাম। বিশ্ব আজ তথ্যের মহা সড়কে বাস করছে। এমন কিছু গোপন রাখা সম্ভব নয়।
… চলবে
লেখক : কলাম লেখক ও রাজনীতিক