
এমরান চৌধুরী
অনেকদিন আগের কথা। সে সময় বোখারা শহরটি ছিল ইরানের অন্তর্গত। বর্তমানে শহরটি উজবেকিস্তানে। সেই বোখারার বাদশাহ নুহ বিন মনসুর একদিন কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। দেশ-বিদেশ থেকে আনা হলো বহু খ্যাতনামা চিকিৎসক। তাঁরা তাঁদের সাধ্যমতো চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউ বাদশাহর রোগ কী তা ধরতে পারলেন না। রাজরবারের সবাই চিন্তায় পড়লেন। মহাচিন্তায়। বাদশাহর তবে ভালো হবে না! দিন যায়। মাস পেরোয়।
একদিন দরবারে এসে উপস্থিত হলেন এক তরুণ চিকিৎসক। তিনি বাদশাহর চিকিৎসা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। উপস্থিত দরবারের চিকিৎসকদের পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি শুরু হলো। ভাবখানা অনেকটা তাচ্ছিল্যের। কিন্তু এতটুকু দমলেন না তরুণ চিকিৎসক। তিনি বাদশাহর চিকিৎসার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। বাদশাহ তাঁকে অনুমতি দিলেন। শুরু হলো চিকিৎসা। তরুণ চিকিৎসকের চিকিৎসার গুণে বাদশাহ অল্পদিনেই সুস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি খুশি হয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু তরুণ কোনো পুরস্কারই গ্রহণ করতে রাজি হলেন না।
এসময় তিনি বিপুল সম্পদ ও উচ্চপদের বদলে কেবল বাদশাহ্র কাছে তাঁর দরবারের গ্রন্থাগারে পড়াশোনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। বাদশাহ তাঁর এ প্রার্থনা মঞ্জুর করেন। জ্ঞানার্জনে প্রবল অনুরাগী সেই তরুণ চিকিৎসকটি ছিলেন ইবনে সিনা, পরবর্তীকালে যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও দার্শনিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এভাবে ইবনে সিনা শাহী গ্রন্থাগারে প্রবেশের সুযোগ পান। গ্রন্থাগারের ভিতরে গিয়ে অবাক হয়েছিলেন তিনি। কারণ এমন সব বইয়ের সন্ধান তিনি সেখানে পেয়েছিলেন, যেগুলো এর আগে কোনদিন দেখেননি। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে ঐ সময়কার সকল লেখকদের বইয়ের অমূল্য ভান্ডার ছিল এই গ্রন্থাগার। সব লেখকের নাম এবং তাঁদের রচনাসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা তৈরির পর, তিনি সেগুলো অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। বইয়ের ভেতর তিনি এমনই ডুবে দিয়েছিলেন যে, নাওয়া- খাওয়ার কথাও তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।
ইবনে সিনা বুখারার খার্মাতায়েন জেলার আফসানা নামক স্থানে ৯৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম সিতারা। ইবনে সিনার পিতা বুখারার সামানীয় সাম্রাজ্যের (৮১৯-৯৯৯) অধীনে একজন সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন।
ইবনে সিনার পুরো নাম আবু আলি হুসাইন বিন আব্দুল্লাহ ইবনুল হাসান বিন আলী ইবনে সিনা। তিনি পাশ্চাত্যে ল্যাটিন ভাষায় আভিসেনা (আরপবহহধ), হিব্রু ভাষায় আভেন সিনা (আবহ ঝরহধ) নামে পরিচিত ছিলেন। সব নাম ছাপিয়ে তিনি ইবনে সিনা নামে সমধিক পরিচিত।
শৈশব থেকেই ইবনে সিনা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন কণ্ঠস্থ করেছিলেন । শুধু তাই নয়, অল্প কিছুকালের মধ্যে তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতি, অ্যারিষ্টটলের দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভারতীয় বীজগণিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর অনুরাগ ছিল ছোটবেলা থেকেই। অন্যদিকে তাঁর পিতার ইচ্ছা ছিল আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন। পিতার ইচ্ছামতো আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন শেষ করে ১৮ বছর বয়সে তিনি গণিত ও চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়া শুরু করেন এবং যথেষ্ট কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
ইবনে সিনা দর্শন চর্চা করেছেন, বিজ্ঞান চর্চা করেছেন, জোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে যুক্তিবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, অংক ইত্যাদি সব জ্ঞান চর্চা করেছেন। কথিত আছে, ইবনে সিনা যখন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো তাঁর মানসপটে স্বপ্নের মতো ভাসত। তাঁর জ্ঞানের দরজা খুলে যেত। ঘুম থেকে উঠে তিনি সমস্যার সমাধান করে ফেলতেন! চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি নিখিল বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘আল কানুন ফি খাল টিব্ব একটি চিকিৎসা বিষয়ক বিশ্বকোষ, যা দীর্ঘকাল ইউরোপে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একমাত্র নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। বহু মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি একটি প্রামাণ্য চিকিৎসা শাস্ত্রের পাঠ্যবই হিসেবে যুক্ত করেছিল। ১৬৫০ সাল পর্যন্ত গ্রন্থটি সরাসরি পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহার হতো। মানবদেহের অঙ্গ সংস্থান ও শরীর তত্ত্ব সন্বন্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। এসব তথ্য সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত সব দেশের চিকিৎসকরা অনুকরণ করেছিলেন। কাঁধের সন্ধিচ্যুতিকে সোজা করার একটি পদ্ধতি আজও তাঁর নামকে বহন করে চলেছে। তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘কিতাব আশ- শিফা। দর্শন এবং চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও ইবনে সিনা’র রচনা সংকলনে জ্যোতির্বিজ্ঞান, আলকেমি, ভূগোল এবং ভূতত্ত¡, মনোবিজ্ঞান, ইসলামী ধর্মতত্ত¡, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং কবিতা বিষয়ক লেখাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইবনে সিনা অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী খোয়ারিজমে গিয়েছিলেন তিনি। খোয়ারিজমের বাদশাহ তাঁকে রাজচিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। খোয়ারিজমের রাজসভায় আরও বহু পন্ডিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল বেরুনী। ইবনে সিনা, আল বেরুনী’র মতো পন্ডিতের পান্ডিত্যের খ্যাতি একদিন গজনীর সুলতান মাহমুদের কানে পৌঁছল। সুলতান মাহমুদ খোয়ারিজমের সুলতানের কাছে খবর পাঠালেন পন্ডিতদের তাঁর দরবারে পাঠানোর জন্য। সুলতান মাহমুদের বার্তা উপেক্ষা করার মতো সাহস খোয়ারিজমের বাদশাহর ছিল না। ফলে তিনি ইবনে সিনা, আল বেরুনীসহ সকল পন্ডিতকে সুলতান মাহমুদের দরবারে প্রেরণ করলেন। কিন্তু ইবনে সিনা সুলতান মাহমুদের এই দাবি মেনে নিতে পারলেন না।
সুলতান মাহমুদের রাজসভায় যোগ দিতে তাঁর ঘৃনাবোধ হচ্ছিল। ফলে তিনি সুকৌশলে নিজেকে মুক্ত করে অন্যত্র পালিয়ে যান। কিছুদিন পর সুলতান মাহমুদ জানতে পারেন ইবনে সিনা ইরানের রাজপন্ডিতের পদ অলংকৃত করেছেন। এ খবর পেয়ে সুলতান তাঁর লোকদের নির্দেশ দিলেন যেভাবেই হোক ইবনে সিনাকে তাঁর দরবারে নিয়ে যেতে।স্বেচ্ছায় আসতে না চাইলে বন্দী করে নিয়ে আসারও হুকুম দেন সুলতান মাহমুদ। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার এই পরিকল্পনার বিষয় তিনি আগেভাগে টের পেয়েছিলেন। ফলে গোপনে পালিয়ে যান ইরানের সুপ্রাচীন শহর হামাদানে। হামাদানে বেশ কিছুদিন ছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে তাঁর উপস্থিতি সুখকর ছিল না। সেখানে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন। ফলে তিনি চলে আসেন ইস্পাহানে। জীবনের অবশিষ্ট সময় তিনি এখানেই কাটান।
ইবনে সিনা’র মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানী সে যুগে কেউ ছিলেন না। শুধু তাই নয়, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও গণিতে তাঁর মতো পন্ডিত ব্যক্তি সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত দ্বিতীয় কেউ আবির্ভূত হননি। তিনি ছিলেন সমসাময়িক কালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক।
বহুবিদ্যাবিশারদ ইবনে সিনা চিরকুমার ছিলেন। ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম সহস্রবার্ষিকী পূর্ণ হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) জাঁকজমকের সাথে ঐ বছরটি পালন করেছে। তাঁর লেখা বহু গ্রন্থ সে সময় পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক










