আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে

3

ফারুক আবদুল্লাহ

জিম্মিদশা থেকে মুক্ত নাবিকরা দেশে ফেরায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। বইছে সবার ঘরে আনন্দ-উচ্ছাসের বাঁধভাঙ্গা বন্যা। কারণ, স্বজনরা এই দিনটির জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে নাবিকদের বহন করা জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি-৩’ চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) এক নম্বর জেটির দিকে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে জাহাজটি দেখতে পেয়ে স্বজনরা নাবিকদের কাছে পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে জাহাজটি জেটির দিকে এগোচ্ছে। অল্পক্ষণ পর জাহাজটি জেটিতে ভিড়লে আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে সবখানে।
এমন সময় এমভি আবদুল্লাহর প্রধান কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ খান জাহাজ থেকে নেমেই তার আদরের দুই কন্যাকে বুকে জড়িয়ে নেওয়ার মুহূর্ত এক অন্যরকম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময়ের পর বাবাকে কাছে পাওয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাসে আত্মহারা হয়ে উঠে সন্তানরা। এ সময় বাবার দুই গালে সন্তানদের চুমু দিতে দেখা যায়।
সোমালিয়ার জলদস্যু কবলমুক্ত জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ক্যাপ্টেন আব্দুর রশিদ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর বললেন, জলদস্যুদের হাতে জিম্মির পর নাবিকদের কেউ কেউ কান্নাকাটি করছিলেন। সবার মনে ভয় ছিল। একই সঙ্গে ছিল মৃত্যুর হুমকি। তবে সবাই সাহস রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি জীবনে প্রথম এমন পরিস্থিতির শিকার হলাম। মনে ভয় ছিল, কিন্তু সাহস হারাইনি। স্বাভাবিক চলাফেরা করতাম। আমাদের কোনো ক্রুর কোনো ক্ষতি যাতে না হয়, সেদিকে নজর রেখেছি। সেফটি অফ লাইফটাকে প্রাধান্য দিয়েছি।’ দেশে ফেরার অনুভূতি সম্পর্কে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সবাই সুস্থ ও অক্ষতভাবে ফিরতে পেরেছি, পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছি। এ এমন এক অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
এসময় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ বলেন, জলদস্যুদের হাতে জিম্মি অবস্থায় সর্বক্ষণ মৃত্যুভয় তাড়া করেছে নাবিকদের। সবসময়ই গুলিভর্তি অস্ত্র মাথায় তাক করে রাখত জলদস্যুরা। মনে হতো, যেকোনো সময় ট্রিগারে চাপ পড়বে। এমন পরিস্থিতি থেকে আমরা ফিরে এসেছি। বলা যায়, মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে এসেছি।
তানভীর বলেন, যখন ইউএস নেভি শিপ আমাদের জাহাজের কাছাকাছি আসতে থাকে, তখন জলদস্যু আমাদের ঘিরে ফেলে। জাহাজের ভেতরে আমাদের একটি জায়গায় জড়ো করে রাখে। মাথার ওপর অস্ত্র ধরে রাখে। তখন জলদস্যুরা আমাদের বলেছিল, নেভি শিপ থেকে যদি আক্রমণ করা হয়, তাহলে তারা আমাদের কাউকে রেহাই দেবে না। তারা আমাদের সামনে রাখবে, যেন নেভি শিপ থেকে গুলি করলে আমাদের গায়ে লাগে। আসলেই আমরা ভয় পেয়েছিলাম। এবং স্বীকার করতেই হবে, আমাদের মৃত্যুভয় পেয়ে বসেছিল। সবাই কান্না শুরু করে দেয়।
তিনি বলেন, আমাদের সব মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। দুয়েকজন কৌশলে মোবাইল রেখে দিতে পেরেছিল। সেটা দিয়ে যোগাযোগ করতাম সবাই। পরিবারকে কেউ বুঝতে দিত না, সবাই সুন্দরভাবে কথা বলতাম। কিন্তু কথা শেষ করেই অনেকে ইমোশনাল হয়ে যেত, কান্নায় ভেঙে পড়ত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের একেকটা দিন যে কীভাবে গেছে, সেটা আমরা বলে বোঝাতে পারব না। প্রতি মুহূর্তে আজকের দিনটার জন্য ওয়েট করেছি। কখন দেশের মাটিতে ফিরব, কখন পরিবারের কাছে ফিরব, সেজন্য ওয়েট করেছি। ফিরতে পারব, এমন নিশ্চয়তা তো ছিল না। আগেই বলেছি, মৃত্যুক‚প থেকে ফিরেছি।
স্বামীর অপেক্ষা জেটিতে বসে ছিলেন তানভিরের স্ত্রী মায়মুনা আক্তার। মুখে হাসি নিয়ে বলেন, সংসারে স্বামীই তো সবচেয়ে আপন। এই আপনজনের কিছু হলে আমিই প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হবো। মুক্তি পেয়ে অনেক দিন পর এসেছে। এতদিন পর কাছ থেকে তাকে দেখতে পাবো, আমি অনেক খুশি। সেখানেই দেখা যায় নাবিক নুরউদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসকে। স্বামী নুরউদ্দিনকে কাছে পেয়ে হাতে হাত রেখে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। নুরউদ্দিন বললেন, ওই ঘটনার পর মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত ছিলাম আমি। এখন কিছুটা ভালো আছি। কিন্তু দুঃসহ সেই স্মৃতি, ভুলতে পারছি না।
পাশে দাঁড়ানো ছেলেকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিতে আসা জ্যোৎস্না বেগম বললেন, গত দুই মাস যে আমাদের কেমন গেছে তা বলে বোঝাতে পারব না। এবার আমাদের কোনো ঈদ ছিল না। আজই যেন আমাদের ঈদ।