আল বিরুনি : ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী

2

এমরান চৌধুরী

আল বিরুনি ছিলেন মধ্যযুগের বিশিষ্ট আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তাঁর প্রকৃত নাম আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি। সাধারণভাবে তিনি আল বিরুনি নামেই বেশি পরিচিত। বিরুন একটি ফারসি শব্দ। ফারসিতে ‘বিরুনি’ শব্দের অর্থ বাইরের জেলা থেকে।
তিনি খোয়ারিজমের মূল শহরের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই তার নামের সাথে অতিরিক্ত ‘আল বিরুনি’ অংশটি যোগ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল বেরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি সর্বপ্রথম ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।
তিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। অধিকন্তু ভূগোল, দর্শন, ইতিহাস, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত¡ ও ধর্মতত্তে¡র নিরপেক্ষ বিশ্লেষক ছিলেন তিনি। স্বাধীন চিন্তাধারা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচনা এবং সঠিক মতামতের জন্য তিনি ছিলেন একটি সর্বজনীন প্রতিভা।
তার সবচেয়ে উজ্জ্বল আবিষ্কারগুলি তাঁর সময়ের অধিকাংশ পন্ডিতের কাছে বোধগম্য ছিল না। ইতিহাস বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সার্টন আল-বিরুনিকে ‘ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আল বিরুনি ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের খোয়ারিজম (বর্তমান খিভা) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছিল অক্সাস নদীর তীরে খেলাধুলা করে। তখন সেখানে খোয়ারিজম রাজবংশের শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। খোয়ারিজম শাসকরা প্রত্যেকেই জ্ঞান চর্চার উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তারা জ্ঞানের নতুন নতুন শাখায় আরোহণের জন্য তৎকালীন পন্ডিতদের সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করতেন
ফলে শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে দ্রুত সামনে অগ্রসর হয়। সেই গৌরবময় পথচলার অন্যতম একজন অগ্রনায়ক হলেন আল বিরুনি।
আল বিরুনি শৈশবেই মা-বাবাকে হারান। ফলে তিনি কোথায়, কার কাছে বড় হয়েছেন এবং কোথায় পড়ালেখা করেছেন, এসব বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, সমসাময়িক মুসলিম বালকদের মতো তিনি মক্তব এবং মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি স্বীয় জন্মভূমিতে কাটিয়েছেন। তিনি গণিত শাস্ত্রবিদ আবু নাসের ইবনে আলী ইবনে ইরাক জিলানি এবং আরও কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন। আল বিরুনির মাতৃভাষা ছিল খোয়ারিজিম, যা ছিল আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু তিনি তাঁর রচনাবলি আরবিতে লিখে গেছেন। আরবি ভাষায় তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল।অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ আরবি এবং ফারসি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ। তিনি প্রাচীন গ্রীক সম্পর্কে চমৎকার জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানীদের লেখা অনেক কিতাব অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অ্যারিস্টেটল, ইউক্লিড, আর্কিমিডিস এবং টলেমি উল্লেখযোগ্য।
আল বিরুনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নিজ শহর ছেড়ে বর্তমান তেহরানের নিকটবর্তী রাভিতে গমন করেন। তবে তিনি নিজ জন্মস্থানের বাইরে তেমন পরিচিত ছিলেন না বলে কোনো ভালো ওস্তাদের আনুকূল্য পাননি। অবশ্য এজন্য তিনি এতটুকু হতাশ বা বিচলিত ছিলেন না । তিনি ছিলেন পরম আত্মবিশ্বাসী। একদিন এমন একটি ঘটনা ঘটে যা আল বিরুনির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আল-খুজান্দি নামে একজন জ্যোতির্বিদ সূর্যের গতিপথের উপর পর্যবেক্ষণ করে রাভির অক্ষাংশ পরিমাপ করেছিলেন। সেই পরীক্ষার ফলাফল দেখে আল বিরুনি আল-খুজান্দির ফলাফলকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। তার ‘স্থানের স্থানাঙ্ক নির্ধারণ এবং স্থানগুলির মধ্যে দূরত্ব সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য’ আল-বিরুনি আরো উন্নত ও নির্ভুল ব্যাখ্যা করেন। এই পর্যবেক্ষণের কারণে তিনি দ্রুত খ্যাতি লাভ করেন।
১০১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি খোয়ারিজমের রাজা সুলতান বিন মাহমুদের অনুরোধে জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। শাহি দরবারে রাজ জ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। ১০১৭ সালে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ ভ্রমণ করেন। তিনি সেখানে ১২ বছর অবস্থান করেন। ভারতে প্রচলিত হিন্দু ধর্মের গূঢ় তত্ত¡ অন্বেষণের পর ‘কিতাবুল তারিকিল-হিন্দ ‘(ভারতের ইতিহাস) শিরোনামে ভারতীয় সংস্কৃতির ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন। ১১ শতকের প্রথম দিকে ভারত সম্পর্কে তাঁর পান্ডিত্যপূর্ণ বস্তুনিষ্ঠতা তাঁকে আল-ওস্তাদ (দ্য মাস্টার) উপাধিতে সম্মানিত করেছিল।
আল বিরুনির ভারত থেকে ফেরার কিছু দিন পর সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। তাঁর উত্তরাধিকারী হন তাঁর পুত্র মাসউদ। তিনি ১০৩০ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান মাসউদ আল বিরুনিকে খুব সম্মান করতেন। আল বিরুনি তাঁর অনুরাগী হিসেবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম রাখেন, ‘কানুন মাসুউদি’এবং তা সুলতান মাসউদের নামে উৎসর্গ করেন। ১১ খন্ডে সমাপ্ত গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত খুশি হয়ে আল বিরুনি-কে এক হাতির ওজনের সমপরিমাণ রৌপ্য উপহার দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করেন। সব রৌপ্যই রাজকোষে ফিরিয়ে দেন।
আরবি, ফারসি, সিরিয়া, গ্রিক, সংস্কৃতি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষার উপর ছিল তাঁর পান্ডিত্য। ত্রিকোণমিতিতে তিনি বহু তথ্য আবিষ্কার করেছেন। পৃথিবীর ভূতাত্তি¡ক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করার সময়, আল বিরুনি বলেন যে ‘পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রটিও তার পৃষ্ঠে স্থানান্তরিত পদার্থের অবস্থান অনুসারে পরিবর্তিত হয়। সময়ের সাথে সাথে, সমুদ্র শুষ্ক ভূমিতে পরিণত হয় এবং শুষ্ক ভূমি হয় সমুদ্র।’ উদাহরণস্বরূপ, তিনি আরব মরুভূমির কথা বলেছেন, যা ছিল একটি সমুদ্র এবং তারপর বালিতে ভরা। তিনি পাথর আবিষ্কারের খবরও দিয়েছিলেন। সেগুলি যদি ভেঙে যায় তবে শাঁস, গরুর খোল এবং মাছের কান পাওয়া যাবে। মাছের কান দ্বারা তিনি জীবাশ্ম বুঝিয়েছিলেন। জ্যোতিষ হিসেবেও তাঁর প্রসিদ্ধি ছিল । তিনি যে সব ভবিষ্যৎবাণী করতেন সেগুলো সঠিক হতো।
বিজ্ঞানী নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর আগে আল বেরুনী The Formula of Intarpolation আবিষ্কার করেন। কিন্তু পাশ্চাত্য পন্ডিতগণ এটিকে নিউটনের আবিষ্কার বলে প্রচার করার চেষ্টা করেছেন। তিনিই বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা আবিষ্কার করেন। ফুলের পাপড়ি সংখ্যা ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হয় কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হয় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও তার অবদান ছিল সর্বাধিক।
আল-বেরুনির চিকিৎসা বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থটির নাম ‘কিতাব আল-সায়দানা ফি আল-তিব্ব’। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন রোগ ও তাদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত ঔষধপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এছাড়াও, তিনি বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের গুণাগুণ ও ব্যবহারবিধি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এসব তথ্য চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
আল বিরুনি শুধু পদার্থবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন না, একজন ইতিহাসবিদ, কালানুক্রমিক এবং ভাষাবিদ হিসেবেও নিজের স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
মৃত্যুর ১৩ বছর পূর্বে তিনি তাঁর রচিত গ্রন্থের যে তালিকা দিয়েছেন সে অনুযায়ী তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১১৩টি। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ এবং ১০টি অসম্পূর্ণ। পরবর্তী ১৩ বছরে তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
আল বিরুনি ছিলেন প্রবল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ত¡। ইউরোপীয় পন্ডিদের মতে, তিনি ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকোষ এবং তাঁর প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানের আধার। ভারতীয় পন্ডিতরা আল বিরুনিকে জ্ঞানের সমুদ্র বলতেন। এই জ্ঞানের বিশ্বকোষ এবং সমুদ্র তুল্য মনীষী আল বিরুনি ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার ৭৫ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রেখে যান মুসলিম বিশ্বের জন্য অফুরান জ্ঞানের ভাÐার।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক