
ফারুকুল আলম চৌধুরী
পবিত্র ইসলামের মহান আদর্শ ও রাসূলে করিম (দ.)’র পবিত্র সুন্নাহকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করার নিমিত্তে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন এবং সে আদর্শের আলোকরশ্মিতে উদ্ভাসিত হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন ইসলামের মহান সুফী সাধকগন। এই সাধক পুরুষদের মধ্যে ক্ষণজন্মা আলোকবর্তিকা ও অন্যতম অলি আল্লাহ হলেন রাহবার-ই হাকিকৃত ও মারেফাত, চৌহর দরবার শরীফের প্রধান খলিফা-ই আকরাম ও গাউসিয়াতের আলোকবর্তিকা আওলাদে রাসূল (দ.) হাফেজ-ক্বারী আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটী পেশোয়ারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।
মূলত তাঁর মাধ্যমেই এ উপমহাদেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে সিলসিলা এ কাদেরিয়া সিরিকোটিয়া প্রসার লাভ করে। তাঁর সান্নিধ্য ও সাহচর্যে অনেকেই ইনসান এ কামেলে পরিনত হন। সেসব ইনসান এ কামেলরাই এই সিলসিলা এ কাদেরিয়ার মিশন প্রচার প্রসারে অনন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সিরিকোট দরবার শরীফ এর নেয়ামতপ্রাপ্ত তেমনি এক ক্ষনজন্মা ব্যক্তি হলেন খলিফা-এ সিরিকোট হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব আবু বকর চৌধুরী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
চট্টগ্রামে সুন্নিয়তের পুরোধা তথা সিরিকোট দরবার শরীফের উজ্জল নক্ষত্র আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রাহ.) চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার (সাবেক পটিয়া থানা) বরকল ইউনিয়নের পাঠানদন্ডী নামক এক দুর্গম পল্লীর সমভ্রান্ত উজির আলী চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ওয়াহেদ বকসু চৌধুরী, মাতা রকিমুন্নেসার একমাত্র পুত্র সন্তান আল্লামা আবু বকর চৌধুরী। তিনি শৈশবে ও যৌবনে অত্যন্ত মেধাবী, সহজ সরল ও বিনয়ী ছিলেন। তিনি ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পারদর্শিতা ও অসাধারন পান্ডিত্য অর্জন করেন। কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন শেষে তিনি একাধারে ৩৭ বছর চন্দনাইশস্থ সুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
বায়াত গ্রহণ : পশ্চিম পাকিস্তানের সিরিকোট দরবার শরীফ হতে হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি পেশোয়ারী (রাহ.) ত্বরিকতের মশাল নিয়ে ১৯৪৬ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে শুভাগমন করেন। সে যুগে তিনি পেশোয়ারী হুজুর হিসেবে সুদুঢ় আফ্রিকা, বার্মা, বাংলাদেশে সর্বত্রই পরিচিত ছিলেন। সেই সময় তিনি কোন এক শুভক্ষণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশস্থ বরকল ইউনিয়নের পাঠানদন্ডী গ্রামে তশরিফ আনেন এবং ত্বরিকতের দীক্ষা (বায়াত) প্রদান করেন। সেই দীপ্তময় শুভক্ষণে আবু বকর চৌধুরী (রা.) বায়াত গ্রহন করেন আওলাদে রাসূল হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ (রা.)’র পবিত্র নুরানী হাতে। বায়াত হওয়ার পর কামেল পীরের সান্নিধ্যে তিনি সারাক্ষণ মশগুল থাকতেন। হুজুর কেবলা’র প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও ভালবাসা ছিল পাহাড়ের মতো অটল।
খেলাফত লাভ : বায়াত গ্রহণ করার পর আল্লামা আবু বকর চৌধুরী সিলসিলার কাজে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত করেন। রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরিকত হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রা.) তাঁর সুযোগ্য খলিফা হিসেবে হাজার মানুষের ভীড় থেকে বেছে নিলেন আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) কে। ১৩৭৩ হিজরীর ১৪ই শাবান (১৯৫৪ সালে) হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ (রা.) আল্লামা আবু বকর চৌধুরী কে কাদেরিয়া ত্বরিকার খেলাফত প্রদান করেন। বায়াত করার নিয়ম কানুন ও ছবকসমুহ প্রদানসহ তাঁকে মুসলমানদের মুরিদ করে দ্বীন ইসলামের খেদমতে আত্মনিয়োগের অনুমতিও দিয়েছিলেন। এত বড় নেয়ামতের প্রাপ্তি ও অধিকারী হয়েও তিনি নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বহুকাল। ইন্তেকালের কয়েকবছর আগেই হুজুর কেবলার লিখিত খেলাফতনামা তিনি উন্মোচন করেন। কথিত আছে খেলাফত লাভের পর তিনি সারাক্ষন হুজুর কেবলার সান্নিধ্যে পড়ে থাকতেন। তিনি এমন দেওয়ানা হয়েছিলেন যে যার জন্য হযরত সিরিকোটি (রা.) পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি মাওলানা আবু বকর শাহ (রা.)’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে মাওলানা সাহেব শান্ত হয়ে যান। হুজুর কেবলা’র প্রতি অতীব আন্তরিকতা তাঁকে একজন আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসেবে পরিগনিত করেছিল। তাঁর সাহচর্যে প্রাপ্ত কিছু তথ্যে এর সত্যতার প্রমান মেলে। আল্লামা আবু বকর শাহ (রা.)’র আম্মার যখন সাকারাত চলছিল তখন তিনি চট্টগ্রামে হুজুর কেবলা সিরিকোটি (রা.) এর সান্নিধ্যে মশগুল ছিলেন। মোনাজাতের পর পীর ভাইয়েরা যখন অন্যত্র চলে যান তখন সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রা.) তাকে বললেন, আপনার আম্মার সাকারাত চলতেছে, আপনি এখনই চলে যান।
আল্লামা আবু বকর শাহ বাড়িতে গিয়ে ঠিকই দেখলেন তার আম্মার অবস্থা, হুজুর কেবলা যা বললেন তাই। তিনি তাড়াতাড়ি আম্মাজানকে একটু পানি পান করান এরপর আম্মা হযরত ইন্তেকাল করেন। অন্য একটি ঘটনা- আবু বকর শাহ (রা.) তার শ্বশুরবাড়ী যাচ্ছিলেন। পটিয়ার মনসার টেক থেকে নেমে পূর্বদিকে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে চট্টলার প্রখ্যাত আউলিয়া গরীব আলী শাহ (রা.) বিপরীত দিক থেকে আসছিলেন। তাঁকে দেখা মাত্রই গরীব আলী শাহ (রা.) সালাম দিলেন। গরীব আলী শাহ (রা.) কাউকে তেমন সালাম দিতেন না এবং তাঁর সালাম দেওয়ার ঘটনা ও বিরল। আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) হুজুর কেবলা সিরিকোটি (রা.) কে এ ঘটনা বলার পর হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোট (রা.) মাওলানা সাহেবকে বললেন যে, আপনি খুবই ভাগ্যবান।
কর্ম ও অবদান : অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পৃষ্টপোষকতা করেন তিনি। ওফাত পর্যন্ত তিনি পাঠানদন্ডী গাউসিয়া পাঠাগারের আজীবন সভাপতি ছিলেন। তিনি পাঠানদন্ডী তাহেরিয়া সাবেরিয়া সুন্নিয়া আলিম মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ভূমিদাতাদের একজন। ১৯৮৬ সালে হুজুর কেবল শাহসুফি আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়ব শাহ কেবলা (রা.) গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’র প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে এগিয়ে আসার ডাক দিলে আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) চন্দনাইশ’র আলেম ওলামা, পীরভাইদের নিয়ে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ চন্দনাইশ উপজেলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হিসেবে আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) চন্দনাইশ উপজেলা গাউসিয়া কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির পদ অলংকৃত করেন।
এ মহান সাধক ১৯৫৭ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করেন এবং ১৯৮৭ সালে পবিত্র আজমীর শরীফ জেয়ারত উপলক্ষে ভারত গমন করেন।
আল্লামা গাজী শেরে বাংলা (রা.) হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি (রা.)’র শানে লিখেছিলেন, ‘ই-চুনি পীরে মগা হারগিচ না দিদম দরজাহা’ অর্থাৎ এ বিশ্ব জাহানে তাঁর (শাহ সিরিকোটি রা.) মতো এমন মহান অলি আর দেখিনি। এমন একজন মহান অলি আল্লাহর খলিফা ছিলেন আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.)। কাদেরিয়া ত্বরিকায় মুরিদ করার অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও মুরিদ করার চেয়ে নিজের পীরের দরবারের গোলাম হয়ে সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন আত্মপ্রচার বিমুখ। এ কারণে আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.)’র জীবনের অনেক কিছুই লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। হুজুর কেবলার নির্দেশে আবালবৃদ্ধবনিতাকে আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি আজীবন সংগ্রাম ও পরিশ্রম করে গেছেন। তিনি দূরদূরান্ত সফর করে বিভিন্ন মাদরাসা মসজিদ, মাজার শরীফে গমন করে সুন্নিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার করে গেছেন।
ওফাত : দরবার এ আলিয়া কাদেরিয়ার আলোকবর্তিকা এ মহান সাধক অসুস্থবস্থায় নিজের অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করে তাঁর অন্তিম সফরের সংবাদ জানিয়ে দেন। এমতাবস্থায় ১৯৯৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯ রবিউস সানী শনিবার বিকাল ৩টার সময় তিনি সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মাওলায়ে হাকিকীর সান্নিধ্যে সফর করেন। অসংখ্য ভক্ত ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে তিনি পাঠানদন্ডীস্থ মাজার শরীফে শুয়ে আছেন। সিরিকোট দরবার শরীফের পরীক্ষিত খাদেম আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) ছিলেন একজন অলি আল্লাহ। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের সমাপ্তি হলে ও কর্মের মাঝে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। খলিফা এ সিরিকোট আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা.) দ্বীনি ও রুহানী শিক্ষার মাধ্যমে যে অনুপম আদর্শ রেখে গেছেন, আল্লাহ আমাদেরকে এই মহান অলির জীবনাদর্শ অনুসরণের তৌফিক দান করুন-আমিন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
আল্লামা আবু বকর চৌধুরী (রা:) এর দৌহিত্র










