আলীকদমে দুই প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

9

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম

বান্দরবানের এক সময়ের আদর্শ উপজেলা আলীকদমে আগামিকাল বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৬ষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচার-প্রচারণা এখন তুঙ্গে। প্রার্থীরা প্রতিদিন-রাতে নানা স্থানে পথসভা করছেন এবং তাদের কর্মীরা যাচ্ছেন ভোটারের দরজায়। প্রশাসনও নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণভাবে করতে প্রস্তুতি নিয়েছে জোরেসোরেই। গত শুক্রবার নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করা হয়েছে।
আগামিকাল বুধবার সারাদেশের ১৫০ উপজেলায় প্রথম ধাপের এই নির্বাচনে যুক্ত হয়েছে বান্দরবানের বাঙালি অধ্যুষিত উপজেলা আলীকদম। তবে পাহাড়ি ভোটারের সংখ্যাও অর্ধেকের কাছাকাছি এ উপজেলায়।
আলীকদম উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ৩২ হাজার ৮০৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১৬ হাজার ৫২১ জন এবং নারী ভোটার ১৬ হাজার ২৮৪ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ২১টি এবং ভোট কক্ষের সংখ্যা ৯৪টি। ২০১৯ সালের তুলনায় এ উপজেলায় ভোটার বেড়েছে ৩ হাজার ৭২১ জন।
আলীকদম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন দুুইজন। তারা হলেন বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবুল কালাম (আনারস) ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন (দোয়াত-কলম)।
ভাইস-চেয়ারম্যান (পুরুষ) পদে বর্তমান ভাইস-চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন (টিউবওয়েল) ও সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান মো. রিটন (তালাচাবি)। মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদেও প্রার্থী রয়েছেন দুইজন। তারা হলেন বর্তমান মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান শিরিনা আক্তার (প্রজাপতি) ও সাবেক ইউপি সদস্যা ইয়াছমিন আক্তার মণি (পদ্ম ফুল)।
সূত্র মতে, নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়াইয়ের হিসাব কষতেই ভোটাররা ব্যস্ত। ভাইস-চেয়ারম্যান পদ দু’টির প্রার্থীদের হার-জিত নিয়ে ভোটারদের তেমন চিন্তা-ভাবনা নেই। দিন যতই যাচ্ছে ততই চেয়ারম্যান পদের দু’জন প্রার্থীর শিক্ষানুরাগ ও অতীত কৃতকর্ম নিয়েই বেশী আলোচনা হচ্ছে। বর্তমান চেয়ারম্যান টানা তিনবারের চেয়ারম্যান হলেও এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে তার পশ্চাৎবিমুখ নীতি ভোটারদের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে।
অপরদিকে, বাংলাদেশের একমাত্র কলেজবিহীন উপজেলা হিসেবে পরিচিত এই উপজেলায় ‘আলীকদম কলেজ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি জামাল উদ্দিন। তিনি আলীকদম উপজেলায় এমএ ডিগ্রিধারী জনপ্রতিনিধি ও ধার্মিক হিসেবে তাঁর আলাদা একটি পরিচিতি রয়েছে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে বাঙালি অধ্যুষিত ৫টি কেন্দ্রে আনারস প্রতীকের সমর্থন সামান্য ব্যবধানে বেশি থাকলেও অবশিষ্ট ১৬টি কেন্দ্রে দোয়াত-কলম প্রতীক উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে সমর্থন বেশি দেখা গেছে। সর্বমোট ৩২ হাজার ৮০৫টি ভোটের মধ্যে পরিসংখ্যন অনুযায়ী অর্ধেকের কাছাকাছি পাহাড়ি-বাঙালি ভোটের ব্যবধান রয়েছে। এরমধ্যে বাঙালি ভোট ৭০% হিসেবে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার এবং পাহাড়ি ভোট ৫০% হিসেবে সাড়ে ৭ হাজার কাস্টিং হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাস্টিং ভোটের হিসেবে আনারস প্রতীক বাঙালি ভোট ৪৫% এবং দোয়াত-কলম প্রতীক ২৫% ভোট এবং পাহাড়ি ভোটের ১০% আনারস প্রতীক এবং ৪০% দোয়াত-কলম প্রতীকের প্রার্থীর পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় ভোটের ফলাফল আনারস প্রতীক ৮ হাজারের সামান্য বেশী এবং দোয়াত-কলম প্রতীক সাড়ে ৯ হাজারের বেশী ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা। দু’প্রার্থীর মধ্যে ১ থেকে দেড় হাজার ভোটের ব্যবধান থাকার কথা বলছেন তারা।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরে ভোটের মাঠ বেশ জমজমাট দেখা গেছে। তবে আজ ভোররাত ১২টা থেকেই শেষ হয়েছে সব ধরণের প্রচার-প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়েছে প্রচার-প্রচারণা। কর্মীদের এই প্রতিযোগিতায় থেমে ছিলেন না প্রার্থীরাও। প্রতিপক্ষ প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতাকে হেয় করে বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কালাম নিজে ‘দশ ক্লাস’ পড়েছেন, স্ত্রী, এবং ছেলে-মেয়ে মিলে মোট ৪১ ক্লাস পড়েছেন বলে দানু সর্দার পাড়ার পথসভায় বক্তব্য দিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, চেয়ারম্যান প্রার্থী জামাল উদ্দিন জনসমর্থনে এগিয়ে রয়েছেন। রাজনীতি, ব্যবসা ও ঠিকাদারির মাঠ থেকে নির্বাচনের মাঠে এসে এর আগে তিনি দুইবার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমএ ডিগ্রিধারী জনপ্রতিনিধি তিনি পুরো উপজেলার মধ্যে একজনই। এ কারণে তিনি শিক্ষিত প্রজন্ম ও যুবকদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। উচ্চশিক্ষিত ও মার্জিত আচরণের অধিকারী বলে জামালের সুনাম রয়েছে।
অপরদিকে, মো. আবুল কালাম বিগত ৩ বারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এলাকায় তার সুনাম থাকলেও শিক্ষাবিমুখ এবং জনপ্রশাসনের সাথে কার্যকর যোগাযোগ না থাকায় এলাকার উন্নয়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা রাখেননি বলে স্থানীয় ভোটাররা অভিযোগ করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. আবুল কালামের পথসভায় প্রতিপক্ষ প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র হনন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় এবং প্রচারণায় পিভিসি ব্যানার ব্যবহারের অভিযোগে বান্দরবান জেলা নির্বাচন অফিসার গত ৪ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন তাকে। জামাল চেয়ারম্যানের পক্ষের লোকজনও প্রতিপক্ষ কালাম চেয়ারম্যানকে গরু চোরাকারবারী ও চাঁদাবাজ হিসেবে বিভিন্ন পথসভায় বক্তব্য দিয়েছেন। আর এসব বিষয় নিয়েই উপজেলাজুড়ে হাস্যরস্যের সৃষ্টি হয়।