দেশ অনিবার্য এক রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। গত ১৩ নভেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী যে অরাজকতা শুরু হয়েছে, তার রেশ এখনো চলছে। এরমধ্যে আজ ১৭ নভেম্বর পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের রায় ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। এ রায়কে কেন্দ্র করে দলটি আবারও ঢাকায় কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। লক্ষ করা গেছে, গত ১৩ নভেম্বর লকডাউনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যানবাহন ও স্থাপনায় ব্যাপক হারে অগ্নিসংযোগ এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ওই সময় চার দিনে অন্তত ৩২টি যানবাহনে আগুন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ১২ নভেম্বর ৩২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থায় মানুষের কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও শঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরমধ্যে আজকের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আবারও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। ককটেল, বোমাও ফুটছে। এ অবস্থায় ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়েছে, সড়কে পরিবহন কমে গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একধরনের অঘোষিত ছুটি চলছে। এসব মিলিয়ে জনজীবন যেন ফের রাজনৈতিক অস্থিরতার আবর্তে পড়তে যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্ক ও অস্বস্তিতে দিন কাটছে। জানা যায়, আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ অনলাইন প্রচারণায় কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণার পর দেশে আবারও সহিংস ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শার্টডাউনের নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামীলীগের যে কোন বিশৃঙ্খলা মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। অপরদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) শাটডাউনের নামে যেকোন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দমনে পুলিশের প্রস্তুতি রয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলাম, এনসিপিসহ কয়েকটি দল নৈরাজ্য মোকাবেলায় রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এসব সরকারি ও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা জল্পনাকল্পনা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলছে নিঃসন্দেহে। ইতোমধ্যে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম গুজব ঢালপালা মেলে আতঙ্কের পারদে বারুদ ফুটাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞমহল আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, আওয়ামী লীগ এই রায়কে কেন্দ্র করে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে, যা সাধারণ মানুষকে চরম উৎকণ্ঠায় ফেলেছে।
আমরা দেখেছি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির দিনটি ছিল জনসাধারণের কাছে আতঙ্কের প্রতীকস্বরূপ। বিভিন্ন স্থানে আগুন, ককটেল নিক্ষেপ, গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ, রেলপথে নাশকতা এসবের ফলে জনজীবন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং পদ্মা সেতু এলাকায় দীর্ঘ যানজট ইঙ্গিত দেয় সহিংসতার পরিকল্পনা ছিল সুসংগঠিত। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে আওয়ামী লীগের লকডাউন ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে নির্বাচন চায় না এমন মহল জড়িত থাকতে পারে। গতকাল বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আজকের বিচারের রায়ের অধিকতর নিরপেক্ষ ও ও ন্যায্যতা নিশ্চিত দাবি করার পাশাপাশি বিশেষ মহলের নৈরাজ্য সৃষ্টির আশঙ্কার কথাও ব্যক্ত করেছেন। যদিও তিনি বিশেষ মহল বলতে কাকে বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট করেন নি। তবে দেশের যেকোন রাজনৈতিক সংকটকালে সুযোগ সন্ধানীদের নানা অপতৎপরতা বিস্তার ঘটে, তা দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি। দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে মুক্তি চেয়েছে বলেই ’২৪ এর জুলাই বিপ্লবে দেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।
ফ্যাসিস্ট সরকারেরও বিদায় হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সুপরিচিত মুখ নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর আশা করা হয়েছিল, দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থিক খাতে সামগ্রিক একটি পরিবর্তন আসবে। কিন্তু নিয়তি বলে কথা, মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নড়বড়ে অবস্থার মধ্যে এখনও হাবুডুবু খাচ্ছে প্রশাসন। আজ আন্তর্জাতিক দ্রুত ট্রাইব্যুনালের রায়কে কেন্দ্র করে কোনরকম অরাজক পরিস্থিতি সুষ্টি হোক-সেটি দেশের মানুষ আশা করেনা। এক্ষেত্রে সরকার আরো বেশি কঠোর অথচ সহনশীল নীতির মধ্যে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।











