পেঁয়াজ আমাদের নিম্ন-মধ্যবিত্তের কাছে এখন একটি উপাখ্যান মাত্র! একটি সরকারের পতনের কারণ নির্ণয় করলে আলু আর পেঁয়াজের কথা একেবারে বাদ দেয়া যাবে না। প্রত্যক্ষ কারণ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান হলেও বিগত সরকারের পতনের কারণ অনেক যা পরোক্ষভাবে সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যখন দিনের পর দিন বেড়েই চলছিল তখন সরকার একেবারে নির্বিকার ছিল। উন্নয়নের গান ধরে সাধারণ মানুষকে কতক্ষণ ভুলিয়ে রাখা যায়; যদিনা তাদের পাতে গরিবের আলু অথবা একটি ডিমও না জুটে! সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম শুনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথাই মনে পড়ে গেল। অনেক খ্যাদ্যপণ্যসহ পেঁয়াজের দামের ঝাঁজ সহ্য করতে না পেরে দেশের লাখো-কোটি মানুষ ছাত্র-জনতার কোটা আন্দোলনকে সর্বশেষ সরকার পতনের আন্দোলনে নিয়ে গিয়েছিল-তাতে আশা করা হয়েছিল, দেশ এবার মাফিয়া মুক্ত হবে, সিন্ডিকেট ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে, বাজার শান্ত হবে, মানুষ পেটপুরে খেতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই আগের মতই আছে। পাশেলোকে বলে আরো খারাপে আছে। অবশ্যই ভালো থাকার কোন কারণ নেই। প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, সংঘর্ষ, খুন-খারাবি, চাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আগের সংস্কৃতি যেন পুনঃ আগমন ঘটেছে। এরমধ্যে পেঁয়াজের দাম শুনে মনে হতে পারে আসলে জীবনটা একটা পরিহাস। যেখানে মাত্র কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট নির্ধারণ করে ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য। পেঁয়াজের বাজারে হঠাৎ দামের ঝাঁজ বেড়ে যাওয়ার কারণ কি, এ নিয়ে গণমাধ্যমগুলো মাঠে ময়দানে চষে বেড়াচ্ছেন কয়দিন ধরে। তারা যা আবিষ্কার করলেন, তাতে দেখা যায়, গত সপ্তাহের শুরুতে যে পেঁয়াজের দাম ছিল কেজি প্রতি ৭০-৮০ টাকা। তা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে ১২০টাকা ছুঁয়ে গেল! এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, মৌসুমি সরবরাহ সঙ্কট, আবহাওয়াজনিত কারণে ফসলের ক্ষতি, আমদানির জট এবং মধ্যস্বত্বদের অভ্যাসের সমন্বিত ফল। সূত্র জানায়, পেঁয়াজের স্থানীয় মজুদ অক্টোবরের শেষ থেকে দ্রুত কমে যায়; কৃষকরা মাঠ থেকে মজুদ শেষ করে ফেলেছেন এবং নতুন ফসল বাজারে আসতে এখনও মাস দেড়েক সময় লাগবে। ফলে পাইকারি বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে; মাঝারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা সেই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। এ ধরনের মৌসুমি চাপ প্রতি বছরই নভেম্বর-ডিসেম্বরে দেখা যায়। অপরদিকে কৃষকরা বলছেন, পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিক্রিযোগ্য অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে, ফলশ্রুতিতে বাজারে ঘাটতি বেড়েছে ও পাইকারি দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন শুধুমাত্র দুই-তিন দিনে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে গেছে। এসব সংকটের মধ্যে আমদানি সমস্যাও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি এখন আগের তুলনায় খুব একটা সহজ নয়। সীমান্তে লজিস্টিক জট বা ভারতের রফতানি-নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের বাজারকে অস্থির করে তুলে। আর এ অস্থিরতায় ইন্ধন দেয় সিন্ডিকেট তথা মধ্যস্বত্বভোগীরা। বিশেষ কওে, পাইকারি পর্যায়ে গুদামজাত করে রাখা ও মূল্য-প্রবণতা সৃষ্টি করার জন্য কৃত পরিকল্পিত স্টক ব্যবহার এসব অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। বাজার-পর্যবেক্ষণ বলছে : ‘যখন কৃষকের মজুদ শেষ, তখন মজুদদাররা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করে।’ এ আচরণ ক্রেতাদের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ চাপ ফেলে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রæত নিয়ন্ত্রণে আনতে তাৎক্ষণিক আমদানি, গুদাম-মুক্তি ও বাজার-মনিটরিং জরুরি; মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে সাপ্লাই-চেইন ও সংরক্ষণ-প্রণালি শক্ত করলে ভবিষ্যতে এমন অবস্থা একই শক থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। একথা মাথায় রাখতে হবে যে, পেঁয়াজের দাম কবে কমবে, সেটা অবশ্য এখনই বলা যাচ্ছে না। শঙ্কার ব্যাপার, গত বছরের মজুত পেঁয়াজের ১০ শতাংশ রয়েছে। বাকি ৯০ শতাংশ খাওয়া হয়ে গেছে। মুড়িকাটা জাতের পেঁয়াজের আবাদ শুরু হলেও তা বাজারে আসতে আরও মাস দেড়েক লাগবে। এ অবস্থায় আমদানির কোন বিকল্প আছে বলে মনে হয়না। সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সুপারিশ করেছিল, পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ৯০ টাকা পার হলেই আমদানির অনুমতি দিতে হবে। আর সেটা করা হলে একই সঙ্গে শুল্ক ছাড় দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। সুপারিশটা ভালো ছিল। পেঁয়াজ নিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্দিনে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশকে আমলে নিয়ে কাজে পরিণত করলে জনদুর্ভোগ কমবে- এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।











