আবারও অস্থিতিশীলতার পথে দেশের রাজনীতি

2

একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সহমর্মিতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের প্রত্যাশা নিয়ে ’২৪ এর রক্তঝরা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। নানা অভিযোগে অভিযুক্ত বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যেসব ক্ষেত্রে ক্ষোভ জমেছিল জুলাই বিপ্লবে তা প্রশশিত হলেও প্রত্যাশার সিঁড়িতে পা দিতে পারেনি সাধারণ মানুষ। বরং অনেক ক্ষেত্রে জীবনকে হাতে নিয়ে হাঁটার উপক্রম হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দিনের পর দিন বেড়েই চলছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলছে খুন-খারাবি। রাজনৈতিক গণসংযোগ থেকে শুরু করে হাসপাতালে, দোকানপাটে, পথেঘাটে, কাম্পাসে, ঘরের ভিতরে-বাইরে সব জায়গায় চলছে প্রকাশ্যে মব সৃষ্টি করে, গুলি করে, পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যাকাÐ সংঘটিত করার ঘটনা। এ হত্যাকাÐ থেকে শিশু, নারী, বৃদ্ধ-বনিতা কেউ রেহাই পাচ্ছেনা। অপরদিকে নিত্যবাজারেও আগুনঝরা দাম। বেকারত্বের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, বিনিয়োগ থমকে আছে, আড়াই শতাধিক শিল্প-কারখানা বন্ধ, বন্দরে চলছে অস্থিরতা, অর্থনীতির প্রবাহ উল্টো পথে হাঁটছে। এ অবস্থায় দেশের মানুষ আশায় বুক বেধেঁছিল আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের। একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিবাদ ও সংঘাতের মধ্যে নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠানের প্রশ্নে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলা যায়। সরকার যখন থেকে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন তখন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর বিরোধী অবস্থান থেকে আদৌ ফেব্রæয়ারিতে নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় দেখা দিয়েছিল। এরপরও সব সমস্যা কেটে ওঠে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে এমনটি আশা দেশের মানুষ করতে পারে, কিন্তু এ মুহূর্তে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অভিযোগ ও এ সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটের সময় নিয়ে।
আমরা জানি দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ধরে আলাপ-আলোচনার পর ঐকমত্য কমিশনে সংস্কারের যেসব সুপারিশ জমা হয়েছিল, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ। এই সনদে বিএনপিসহ রাজনীতির বড় স্টেকহোল্ডাররা স্বাক্ষরও করেছে। কিন্তু গোল বেঁধেছে এই সনদের ওপর কখন গণভোট অনুষ্ঠান করা যাবে, তা নিয়ে। বিএনপি নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের পক্ষপাতী। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বলছে, নির্বাচনের আগেই গণভোট হতে হবে। এনসিপি অবশ্য বলছে, গণভোট আগেই হওয়া দরকার, তবে একইদিনে হলেও তাদের আপত্তি নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মূল দ্ব›দ্বটা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই আবর্তিত। জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রস্তাবের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি মানা না হলে তারা বড় আন্দোলনে যাবে বলেও আগাম বার্তা দিয়ে রেখেছে। দ্ব›েদ্বর সুরাহা না হলে তারা ১১ নভেম্বর যে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছিল, গতকাল ১১ নভেম্বর ঢাকায় বড় সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে তাও বাস্তবায়ন করেছে দলটি। ওদিকে বিএনপি এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের বল সরকারের কোর্টে ছেড়ে দিয়ে পক্ষান্তরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে জটিল করে দিয়েছে। অবশ্যই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দুই/একদিনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো যদি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলমান দ্ব›েদ্বর নিরসন করবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, সরকারের সিদ্ধান্ত কী রকম হতে পারে? রাজনৈতিক দলগুলো সেই সিদ্ধান্ত কতটুকু মেনে নেবে কিনা?
আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করে যাচ্ছি, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই বিপ্লবকে কোন রাজনৈতিক দলই পুরোপুরি ধারণ করতে পারছেনা। এমনকি ছাত্রদের নবগঠিত দলও। রাজনৈতিক দলগুলো এখন বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। ৫ আগস্ট-পূর্ববর্তী যে অভাবনীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্যে ফাটল ধরছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আগামী ১৩ নভেম্বর সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের ঢাকা লকডাউন ঘোষণা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ঝটিকা মিছিল বের করার সুযোগ করে দিয়েছে চলমান রাজনৈতিক অনৈক্য। ১৩ নভেম্বরের লকডাউন মোকাবেলায় সরকারের আইনÑশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামীলীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক প্রস্তুতির কথা বলা হলেও বাস্তবে অনৈক্যের রাজনীতি কতটুকু মোকাবেলায় দাঁড়াতে পারে তা ভাববার বিষয়। আমরা গভীরভাবে লক্ষ করছি, রাজনৈতিক দুই বিবদমান পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখা দিয়েছে, অনেকে রহস্যজনক বলেও মন্তব্য করেছেন। এরপরও আমরা আশা করব, গণভোটের প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে ফিরে আসবে এবং নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তা না হলে দেশ গভীর সংকটে নিপতিত হবে এবং এর সুযোগে অপশক্তি মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পাবে। আমরা এক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে-এমনটি প্রত্যাশা করি।