আগুনঝরা মার্চ

29

সবক’টা জানালা খুলে দাও না/ আমি গাইব, গাইবো বিজয়েরই গান/ ওরা আসবে চুপি চুপি/ যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ/ চোখ থেকে মুছে ফেল অশ্রুটুকু/ এমন খুশির দিনে কাঁদতে নেই/ হারানো স্মৃতি বেদনাতে/ একাকার করে মন রাখতে নেই/ ওরা আসবে চুপি চুপি/ কেউ যেন ভুল করে/ গেয়ো না’কো মন ভাঙ্গা গান/ সবক’টা জানালা খুলে দাও না/ আজ আমি সারানিশি থাকব জেগে/ ঘরের আলো সব আঁধার করে/ ছড়িয়ে রাখো আতর গোলাপ/ এ দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে/ ওরা আসবে চুপি চুপি/ কেউ যেন ভুল করে/ গেয়ো না’কো মন ভাঙ্গা গান…
একাত্তরের অগ্নিগর্ভ মার্চের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ‘বিহারি’ বসতির পাশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের শোভাযাত্রা অতিক্রম করার সময়
সাদা পোশাকে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের উস্কানিতে সেখানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু হলে পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালায়। এ ঘটনায় সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, সবাই জানত এটা পাকিস্তানিদের একটি চক্রান্ত। এ ঘটনায় সামরিক আইন প্রশাসক ‘বি’ জোন-এর পক্ষ থেকে লোকদেখানো একটি তদন্তের কথা বলে দায়সারা ভাবে দায়িত্ব শেষ করে। তবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানিদের তথাকথিত তদন্ত প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভায় আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের প্রধান এম মনসুর আলীর নেতৃত্বে তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে সেখানে পাঠান।
ওইদিনের রক্তক্ষয়ী পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ১৯ মার্চ পাকিস্তানের করাচি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ডন’ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিবৃতিসহ প্রকাশিত হয়। দ্য ডন পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু তাঁর বিবৃতিতে পাকিস্তানিদের তথকথিত তদন্ত প্রত্যাখ্যানের কারণ ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। সামরিক আইন আদেশের দ্বারা এ ধরনের তদন্তকে আপত্তিকর উল্লেখ করে এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে শেখ মুজিব তাঁর অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন। তিনি বিচারের আগেই অসৎ উদ্দেশ্যে প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে তদন্ত কাজকে প্রভাবিত করারও আভিযোগ করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিবৃতিতে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের গঠিত কমিশন প্রত্যাখ্যান করেন এবং এই কমিশন বা এর কোন সদস্যের সাথে কোন ধরনের সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেন। তিনি সাত মার্চ তারিখে উত্থাপিত দাবিসমূহের আলোকে তদন্তের দাবি জানান। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘটনার তদন্তে তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলেন। অন্যদিকে, এ ঘটনায় মাওলানা ভাসানীও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিগ্রাম করেন।
দ্রæত পরিস্থিতি বদলাতে থাকা একাত্তরের মার্চের ঘটনাবলী নিয়ে ৩০ মার্চ প্রকাশিত লন্ডনভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফে ‘পাকিস্তানে আন্দোলন গুড়িয়ে দিয়েছে ট্যাংক’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৫ মার্চের কালো রাতে একজন সহকর্মীর ফোন পেলেন বঙ্গবন্ধু। এই সহকর্মী তাকে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, রাত দশটা থেকে তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্য ঢাকা ঘিরে ফেলেছে। এর মধ্যে এক ব্যাটালিয়ন সাজোঁয়া যান, এক ব্যাটালিয়ন পদাতিক ও এক ব্যাটালিয়ন গোলন্দাজ সৈন্য রয়েছে। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তবে, তিনি বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে অস্বীকার করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই সহকর্মীকে বললেন, তিনি যদি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান, তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে বের করার অজুহাতে সারা ঢাকা শহর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত এম-২৪ ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সমগ্র ঢাকা মহানগরী ঘিরে ফেলে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে এবং ক্যাম্পাসে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির সামনে অবস্থান নেয় এবং এখান থেকে আবাসিক হল এলাকায় কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একই সময় সৈন্যরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন এলাকায় প্রবেশ করে। এখানে প্রথমে ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয়। পাকিস্তানের সৈন্যদের অপর একটি ইউনিট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘিরে ফেলে। এ সময় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারছিলেন, যে কোন মুহূর্তে তাঁর বাড়ি আক্রান্ত হবে। তিনি বাড়ির গৃহকর্মী এবং তাঁর নিরাপত্তা কর্মী ছাড়া বাড়ির সকলকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেন। রাত একটা ১০ মিনিটে একটি ট্যাংক, একটি সাজোঁয়া যান এবং এক ট্রাক সৈন্য রাস্তার ওপর নামে এবং বাড়ি লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে থাকে। একজন পাক সেনা কর্মকর্তা সামনে এগিয়ে গিয়ে ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুকে নেমে আসতে বলেন। পাক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘শেখ, ইউ সুড কাম ডাউন।’ শেখ মুজিবুর রহমান বাড়ির ব্যালকনিতে বেরিয়ে এসে জবাবে বললেন, ‘ইয়েস। আমি প্রস্তুত। তবে, গুলি করার কোন প্রয়োজন নেই। আপনারা আমাকে প্রয়োজনে টেলিফোনে ডাকতে পারতেন। আমি চলে যেতাম।’ এরপর পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা বাড়ির বাগানে হেঁটে আসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইউ আর আন্ডার এ্যারেস্ট। তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেলেন। এসময় তিনজন গৃহকর্মী, একজন সহযোগী ও তাঁর একজন দেহরক্ষী সঙ্গে ছিলেন।