২০১৯ সালে অনুমোদন হওয়া ২৬১ কোটি টাকার এলইডি বাতি প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। করোনা মহামারির কারণে মেয়াদ একবছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শুরু করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হলে সবে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্ধিত মেয়াদেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব না। এ ছাড়া ভারত সরকারের এলওসির (লাইন অব ক্রেডিট) প্রক্রিয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ায় চিঠি চালাচালির জটিলতার কারণে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় চরম ধীরগতি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার দাশ পূর্বদেশকে জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ভারত সরকারের তত্ত¡াবধানে গত ১৫ জুন ট্রেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ জুলাই টেন্ডার খোলা হবে। এরপর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ গ্রহণপূর্বক কাজ বাস্তবায়ন করবে। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কাজ শেষ হতে বর্ধিত মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে বলে জানান ঝুলন কুমার দাশ।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, ‘মডার্নাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্ট এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬০ কোটি ৮৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে এলওসির (লাইন অব ক্রেডিট) আওতায় ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ অর্থের যোগান দেবে ভারত। ঋণ হিসেবে দেয়া এ অর্থের পরিমাণ ২১৪ কোটি ৪৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা। অবশিষ্ট ১৭ দশমিক ৮০ শতাংশ বা ৪৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৯ জুলাই একনেক সভায় এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শেষ হলে সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ বিল কমে আসবে প্রায় অর্ধেকে। এছাড়াও বাতি নিয়ন্ত্রণের ৫শ সুইচের বদলে হবে মাত্র ৪টি কেন্দ্রিয় সার্ভার স্টেশন এবং সাশ্রয় হবে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা। সিটি কর্পোরেশন সূত্র আরও জানিয়েছে, নগরীতে মোট ১ হাজার ৪৩ কিলোমিটার সড়কে বাতি রয়েছে। তারমধ্যে সোডিয়াম বাতি রয়েছে ৮শ ৯০ কিলোমিটার এবং এলইডি বাতি রয়েছে ১৫৩ কিলোমিটারে। এদিকে অনুমোদিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৪৬৭ কিলোমিটার সড়কে সোডিয়াম বাতির বদলে বসানো হবে এলইডি বাতি। সরানো সোডিয়াম বাতিগুলো নগরীর অবশিষ্ট সড়ক ও নতুন আবাসিকে সংযোজন করা হবে। ফলে নগরীর সবক’টি সড়কে বসবে বাতি। এমনটাই মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকার সড়ক আলোকায়ন ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন কাজ’ শীর্ষক এ প্রকল্পের আওতায় ৪০, ৬০, ৯০, ১০০ ও ২৫০ ওয়াটের ২০ হাজার ৬০০টি এলইডি বাতি এবং ২০ হাজার ২৬৭টি জিআই পোল বসানো হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত এ প্রকল্পের আওতায় ৪১ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ১০ কিলোমিটার সড়কে এলইডি লাইট লাগানো হবে। অন্যদিকে নগরীর আলোকায়নে প্রায় ৫১ হাজার ৫৭৩টি সোডিয়াম বাতি রয়েছে। বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির ও সামাজিক সংগঠন কার্যালয়ের ১ হাজার ৫৩৪টি সুইচিং পয়েন্ট থেকে এই বাতিগুলো ‘অন-অফ’ করা হয়। এ কাজে প্রত্যেক পয়েন্টে নিয়োজিত আছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একজন করে মোট ১ হাজার ৫৩৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিত। তাঁদের প্রত্যেককে ২ হাজার ৫শ টাকা করে সম্মানি প্রদান করে আসছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এমন সুইচ কমে আসবে প্রায় ৫০০টি। ফলে সিটি কর্পোরেশনের সাশ্রয় হবে সাড়ে ১২ লাখ টাকা। জানা গেছে, স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে বাতিগুলোর সুইচ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যার জন্য স্থাপন করা হবে ৪টি কেন্দ্রিয় সার্ভার স্টেশন। যেখান থেকে সহজেই ‘অন-অফ’ ও কমানো-বাড়ানো যাবে। এছাড়াও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত সকল ধরনের ব্যবস্থাপনা খরচ বহন করবে বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
জানা গেছে, বর্তমানে ৪০ ওয়াট টিউব বাতি (ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প), ৬৫ ওয়াট এনার্জি বাতি (সিএফএল), ১৫০ ওয়াট হাইপ্রেসার সোডিয়াম, ৪০০ ওয়াট মেটাল হ্যালাইড বাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলোতে বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডও বৃদ্ধি করে। যা শহরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রফিক এবং পথচারীদের জন্য কার্যকর ও টেকসই সড়ক বাতির আলোক সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। রাত্রিকালীন শহরের সৌন্দর্য, ব্যবসায়িক সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কম কার্বন নির্গমন এবং শক্তি শোষণ সম্পর্কিত পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রাফিক ও পথচারীর জন্য স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সড়ক বাতির আলো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










