মনিরুল ইসলাম মুন্না
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের গণশুনানি হয় প্রতি বুধবার। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রশাসনিক কাজে নিমগ্ন থাকলেও, মানবতার সেবায় তিনি নতুন নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন।
গতকাল জেলা প্রশাসনের গণশুনানিতে তিনি অসংখ্য মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তার এই সেবার উদ্যোগে অনেক অসহায় মানুষের মুখে ফুটছে হাসি, পূরণ হচ্ছে আশা।
সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া গণশুনানিতে জেলা প্রশাসকের অফিসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সেবাপ্রত্যাশী মানুষদের মুখে ছিল এক মিশ্র অনুভ‚তি-আশা-হতাশা আর অশ্রু।
তাদের মধ্যে ছিলেন নাছরীন আকতার, যিনি কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ। তার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার ডোংরা গ্রামে। তার স্বামী করোনাকালে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হন আর্থিকভাবে। দুই সন্তানসহ চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন তিনি। তবে তার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায়, গত ২০ দিনে অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। তাই তিনি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন।
নাছরীন আকতার জানান, স্বামী চাকরি হারানোর পর আমি নিজেই আমার পরিবারকে প্রতিপালন করছিলাম, কিন্তু এখন আমি অসুস্থ। এমন পরিস্থিতিতে আমার চিকিৎসা চালানোর মতো টাকার সংস্থান নেই।
তিনি বলেন, এখন পুরো পরিবার একেবারে নাজুক অবস্থায়। আমি একমাত্র নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ছিলাম, কিন্তু এখন অক্ষম হয়ে পড়েছি।
এদিন জেলা প্রশাসক কাগজপত্র দেখে তাৎক্ষণিক তার জন্য জেলা প্রশাসনের নিজস্ব তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেন। জেলা প্রশাসক নিজেই নাছরীনকে বলেন, আপনার চিকিৎসার জন্য যা যা সহায়তা প্রয়োজন, আমি তা যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা করে দেব।
নাছরীন আকতার এক নতুন আশার সূচনা নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। তবে তার মতো আরও বহু মানুষের গল্প ছিল গণশুনানিতে।
এদিকে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত এ কে এম ফজলুল কাদের আসেন হাটহাজারীর মির্জাপুর থেকে। তার হাত-পা অবশ হয়ে গেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এক সময়ে ব্যবসা করে জীবনযাপন করলেও এখন অসুস্থতার কারণে আর কোনো আয়ের পথ নেই। তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটময় এবং তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন আর্থিক সহায়তার জন্য।
এদিন সেবাপ্রত্যাশী ৩০ জনের মধ্যে প্রায় সবারই প্রধান সমস্যা ছিল আর্থিক সহায়তা। কেউ চিকিৎসা, কেউ শিক্ষা, আবার কেউ মাদ্রাসার জন্য সহায়তার আবেদন করেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন এসে জমির নামজারি সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলেন। এসব সমস্যা শোনার পর জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন, যাতে দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়।
দেখা গেছে, গণশুনানিতে উপস্থিত হয়ে সেবাপ্রত্যাশীরা বিভিন্ন সমাজসেবা বিষয়ে তাদের সমস্যা তুলে ধরেন। তাদের অধিকাংশ আবেদন ছিল চিকিৎসা সহায়তার জন্য। জেলা প্রশাসক, প্রান্তিক মানুষের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের জন্য নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তার সহায়তায় ভরসা পেয়েছেন অনেক মানুষ। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু চট্টগ্রামের জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশে এক মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেন আগত সেবাপ্রার্থীরা।
গণশুনানি শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পূর্বদেশকে বলেন, “প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের অনেক সময় বড় বড় দপ্তরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তাদের সমস্যা সমাধানে আমি এখানে আছি। যতদিন আমার হাতের নাগালে সমাধান সম্ভব, আমি তাদের পাশে দাঁড়াবো। কিছু মানুষ এমন আছেন, যারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসতে পারেন না। তাদের খবর পেয়েই আমি নিজেই নিচে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলি।”
এই মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক জানিয়ে দেন, শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনই তার একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের জীবনের সংকট দূর করতে তার আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকারও।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গণশুনানির মাধ্যমে আরও পাঁচজন মুমূর্ষু রোগী এবং অন্যান্য মানুষদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল শিশুদের চিকিৎসা সহায়তা, এতিমখানা পরিচালনার জন্য অনুদান এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য সহযোগিতা।











