বিবিসি বাংলা
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় আজ সোমবার ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্টার অফিস জানিয়েছে, সকাল ১১টায় এ রায় উপলক্ষে আদালত বসবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম গতকাল বলেছেন, রায়ের যে অংশটুকু ট্রাইব্যুনাল পড়ে শোনাবেন সে অংশটুকু ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন স¤প্রচার করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে অন্য গণমাধ্যমও সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবে।
এদিকে শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ বলছে সব বিষয়কে মাথায় রেখেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, দেশে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আগামীকাল (আজ সোমবার) ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণহত্যার রায়কে কেন্দ্র করে একটা মহল দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য পাঁয়তারা করছে।
আর জামায়াতসহ আট দলের এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সোমবার (আজ) তারা মাঠে থাকবেন এবং কাউকে কোনো নাশকতা করতে দেবেন না।
রায়কে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা এবং সহিংসতা : ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকায় কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং এর অংশ হিসেবে সরকারের দিক থেকে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যেই বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
এর মধ্যে শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের একটি জেলা অফিসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকার হাজারীবাগ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এবং সাভারে তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে শনিবার রাতে। এছাড়া ঢাকায় ইস্কাটন, আগারগাঁও, মধুবাগসহ কয়েকটি জায়গায় হাতবোমার বিস্ফোরণও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস।
এছাড়া শনিবার রাতে গাজীপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি কার্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় গ্রামীণ ব্যাংকের একটি শাখায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে ।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় ‘পূর্ণ ন্যায়বিচার’ দাবি করেছেন। তার এ সম্পর্কিত পোস্টে বলা হয়েছে, আগামীকাল (আজ) বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যেখানে গত বছরের ঢাকায় সংঘটিত প্রাণঘাতী সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা পূর্ণ ন্যায়বিচার দাবি করছি! বাংলাদেশ ডিজার্ভ করে একটি স্বচ্ছ এবং ন্যায়বিচার।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কেউ যেন নাশকতা করতে না পারে সেজন্য তারা মাঠে সক্রিয় থাকবেন।
রায় সম্পর্কে প্রসিকিউশন যা বলেছে : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাসহ আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেটা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার জন্যও তারা আবেদন করেছেন।আমরা ট্রাইব্যুনালে তার (শেখ হাসিনা) সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেছি। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে এই আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মামলায় যারা ভিক্টিম বা শহীদ আছে, আহত পরিবার আছে – তাদের বরাবর হস্তান্তরের প্রার্থনা জানিয়েছি, বলেছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ট্রাইব্যুনাল ন্যায়বিচারের স্বার্থে যে আদেশই দিক না কেন, প্রসিকিউশন সেটা মেনে নেবে।
এ মামলার অন্য দুই আসামি হলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। মামুন এ মামলা ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে কোনো আসামির এ ধরনের ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদনের ঘটনা এটাই প্রথম বলে সেসময় জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। মামলার আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলাটির রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। এর নেতৃত্বে আছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
ওইসময় শেখ হাসিনাই মামলাটির একমাত্র আসামি ছিলেন। পরে চলতি বছরের মার্চে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক আইজিপিকে এ মামলায় আসামি করতে প্রসিকিউশনের করা আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল। ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা।
শেখ হাসিনা ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে গত পহেলা জুন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল ১৭ নভেম্বর (আজ) রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করে।










