বিবিসি বাংলা
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সাত দিনের যে সময়সীমা দিয়েছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, তা প্রায় শেষ হওয়ার পথে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয় কি-না তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। সাত দিনের সেই সীমা সোমবার অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। যদিও দলগুলো নিজেদের মধ্যে একমত হওয়া দূরের কথা, আলোচনাতেই বসতে পারেনি। বিএনপি জানিয়েছে, তারা শুধু সরকার বা কমিশনের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি আছে।
দলগুলো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সরকার নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেবে বলে আগেই সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী- দুই দলই উল্টো এ সংকটের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সরকারকে দায়ী করেছে। উভয় দলই সংশয় প্রকাশ করে বলছে যে, সরকার হয়তো কোনো বিশেষ দলকে সুবিধা দিতে এটি করেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে দলগুলোর সাথে আলোচনার পর নেওয়া সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে না আনা এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে নির্বাচন প্রলম্বিত করার একটি চেষ্টাও থাকতে পারে।
যদিও দলগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র বলছে, সরকার দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দূর করে এক জায়গায় আনতে পর্দার অন্তরালে একটি উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে একটি সমাধানে উপনীত হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এরই মধ্যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিশেষ করে গণভোট কবে হবে- তা নিয়ে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি ও জামায়াত এবং তাদের সমমনা দলগুলো।
বিএনপি ইতোমধ্যেই ঢাকায় সমাবেশ করে বলেছে, জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত এবং নির্বাচন অবশ্যই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই হতে হবে।
অন্যদিকে জামায়াত বলছে, আলোচনার জন্য তারা বিএনপিকে ডাকলেও দলটি তাতে সাড়া দেয়নি। তবে তারা মনে করে, এর জের ধরে অচলাবস্থা তৈরি হলে তার দায় সরকারের।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও রাজনৈতিক দলের নেতারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন গত ১৭ অক্টোবর। কিন্তু পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারের কাছে যখন তাদের সুপারিশ হস্তান্তর করে তখন দলগুলো অভিযোগ করে যে সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বিভিন্ন সুপারিশে দলগুলোর যে বক্তব্য নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে থাকার কথা সেগুলো রাখা হয়নি।
বিএনপি সুনির্দিষ্টভাবে জানায়, সুপারিশ এমন কিছু বিষয় রাখা হয়েছে যা নিয়ে কমিশনের সভায় আলোচনা হয়নি; আবার এমন কিছু বিষয় রাখা হয়নি যাতে সব দল আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় জুলাই সনদে থাকা সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোট কখন হবে তা নিয়ে।
কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ আদেশ জারি করে তার ভিত্তিতে গণভোট হবে। গণভোটে প্রস্তাবগুলো পাস হলে আগামী সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে।
আর এই সময়ের মধ্যে পরিষদ সেটি করতে না পারলে প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে বলে ওই সুপারিশে বলা হয়েছে, যার তীব্র সমালোচনা করেছে বিএনপি।
তবে গণভোট কবে হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। অর্থাৎ সরকার সিদ্ধান্ত নেবে–– গণভোট কি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে হবে, নাকি নির্বাচনের আগেই হবে।
এ নিয়ে সরাসরি বিপরীতমুখী অবস্থা নেয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির দাবি গণভোট হতে হবে সংসদ নির্বাচনের সাথে একই দিনে। আর জামায়াত বলছে, গণভোট হতে হবে সংসদ নির্বাচনের আগে।
ওদিকে দলগুলোর এই মতবিরোধে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপদেষ্টা পরিষদের সভা থেকে গত ৪ঠা নভেম্বর একমত হওয়ার জন্য দলগুলোকে এক সপ্তাহের সময় দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সমঝোতার বদলে এ নিয়ে দলগুলো কার্যত বিএনপি ও জামায়াত, এই দুই বলয়ে ভাগ হয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে।
এমনকি আলোচনার জন্য জামায়াতের তরফ থেকে বিএনপির সাথে যোগাযোগ করা হলেও বিএনপি তাতে সায় দেয়নি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও সরকার সমস্যা তৈরি করেছে। তারা আলোচনা করতে চাইলে আমরা বসবো। অন্য দলগুলোর সাথে আমরা কেন এ নিয়ে আলোচনা করবো, বলেছেন দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তার অভিযোগ কিছু দল যেভাবে চেয়েছে সরকার ও কমিশন সেভাবেই সুপারিশগুলো তৈরি করেছে। তাদের (সরকার ও কমিশন) তৈরি করা সমস্যা তাদেরকেই সমাধান করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীও বলছে, চলমান সংকট অচলাবস্থার দিকে মোড় নেয় কি-না সেটি সরকারের ওপরই নির্ভর করবে এবং কোনো বিশেষ দলকে সন্তুষ্ট করার জন্য সরকার দেশ চালাচ্ছে কি-না সেই প্রশ্ন উঠছে বলে দলটি মনে করছে। সংকটের দায়ভার সরকারের এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশন নিজেই সংকটের পথ তৈরি করেছে। দলগুলো যদি এগুলোর সমাধান করতে পারে তাহলে কমিশন কেন হলো, তারা সুপারিশই বা কেনো করলো। কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দায়িত্ব সরকারের। এখন দলগুলোর দিকে ঠেলে দিবে না।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের যে অবস্থান তাতে যোগ দিয়েছে তাদের সমমনা দলগুলোও। জামায়াতে ইসলামীসহ আট দল ঢাকায় এগারই নভেম্বর সমাবেশ ডেকেছে এবং তাদের দাবি না মানলে সেখান থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার কথাও বলা হচ্ছে। বিএনপিও সাতই নভেম্বরের সমাবেশ থেকে তাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে।
ওদিকে সরকারের দিক থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলার পর জামায়াতের তরফ থেকে আলোচনার জন্য বিএনপির সাথে যোগাযোগ করা হলেও বিএনপি তাতে রাজি হয়নি।
একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো গণতন্ত্র মঞ্চ থেকেও। তারা আলাদাভাবে দুই দলের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েও খুব একটা সাড়া পায়নি বলে জানিয়েছেন গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম।
‘ইতিবাচক কিছু সাড়া পাইনি এখনো, তবে আমরা আশাবাদী। আমাদের চেষ্টাও অব্যাহত আছে। দেখা যাক কী হয়, বলছিলেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকার তরফ থেকে পর্দার অন্তরালে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি।
সেই আলোচনায় দুই দলের সম্মতি পেলে বিএনপির দাবি অনুযায়ী গণভোট সংসদ নির্বাচনের দিন আর জামায়াতের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদের উচ্চপক্ষে পিআর বা সংখ্যানুপাতিক ভোটের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে, এমন আভাসও পাওয়া যাচ্ছে।
প্রকাশ্যে অবশ্য বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই সরকারকে ও কমিশনকেই এমন পরিস্থিতির জন্য দোষারোপ করছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, কমিশনের রিপোর্টটাই ‘একতরফা’, যার সাথে জুলাই সদন যেটি স্বাক্ষর করা হয়েছে তার মিল নেই।
‘তাহলে ৮/৯ মাস ধরে কসরত করার কী দরকার ছিল। সরকার যেটি করেছে সেটি দলগুলোর সাথে প্রতারণার সামিল। এক বছর আলোচনা হলো। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য মানুষ শুনেছে। কিন্তু তার সাথে তো কাজের মিল নেই,’ বলেছেন তিনি।










