আবু মোশাররফ রাসেল
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সাবেক যুগ্ম আহব্বায়ক সরওয়ার আলমগীর। উপজেলার তৃণমূল পর্যায় থেকে উত্তর জেলার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা সরওয়ার আলমগীর দলের যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে এবং কর্মসূচিতে ছিলেন সামনের কাতারে। সে কারণে তিনি বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন মামলা-হামলা, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে নিজের অনুভূতি, অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রসঙ্গ, ফটিকছড়ির উন্নয়ন নিয়ে আগামীর ভাবনাসহ নানা বিষয়ে পূর্বদেশের সাথে কথা বলেছেন তিনি।
পূর্বদেশ : ফটিকছড়ি আসনে আপনি বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন, আপনার অনুভ‚তি জানতে চাই।
সরওয়ার আলমগীর : প্রত্যেক রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন থাকে-‘একদিন জাতীয় সংসদের সদস্য হব।’ কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে, জনগণের আস্থা-ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যমে আস্তে আস্তে সেই পথ খুলে যায়। আল্লাহর রহমতে দলের মনোনয়ন পেয়ে আমি মনে করছি আমার সেই স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু হয়েছে। এজন্য আমি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। একই সাথে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, বিশেষ করে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং ফটিকছড়ি বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি।
পূর্বদেশ : এই আসনে আরও কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন ঘোষণার পর তাদের সাথে কি যোগাযোগ হয়েছে? তারা কি আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন?
সরওয়ার আলমগীর : আমার মনোনয়ন ঘোষণার পর এই আসন থেকে বিএনপির অন্যদের মধ্যে যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তাদের সবার সাথেই ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ হয়েছে। এর মধ্যে বিচারপতি ফয়সাল মাহমদু ফয়জী, বিএনপির সহ তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সাংবাদিক নেতা কাদের গণি চৌধুরী আমাকে ফোন করেছেন, তারা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আমি ঢাকা থেকে ফিরেই আমাদের দলের প্রবীণ নেতা আলহাজ সালাউদ্দিন সাহেবের বাসায় গিয়ে দেখা করেছি, তিনিও আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। আমি আমার ভাইদের নিয়ে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার সাহেবের বাসায় গিয়েছি। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘নমিনেশন তুমি পেয়েছো, তোমাকে অভিনন্দন। আরেকজন আছেন, ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, তিনিও আমাকে বলেছেন ফটিকছড়িতে এসে আমার পক্ষে কাজ করবেন। এই হলো আমার প্রতি নেতাদের ভালোবাসা।
এখন কথা হলো, আমাদের দলটি বড় দল। সঙ্গত কারণেই অনেকেই মনোনয়ন চাইতে পারেন, চেয়েছেনও। সবাই যোগ্য কিন্তু সবাইকে তো মনোনয়ন দিতে পারবে না, একজনকে দিয়েছে। সবাই মিলে আমরা দলের জয়ের জন্য কাজ করবো। দল মনোনয়ন কাকে দিয়েছে? যারা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রোষানলে পড়ে জেলে গেছে, হামলার শিকার হয়েছেন, আমরা যারা ব্যবসা করি; আমাদের তো পুরো ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে শুধু বিএনপি করার কারণে। আমার ব্যবসা কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, সে ইতিহাস বলতে গেলে শেষ হবে না। আমাদের ধরতে গেলে পঙ্গু করে দিয়েছে শুধুমাত্র বিএনপির একজন কর্মী বলে। এই যে এত নির্যাতন-নিপীড়ন হলো, তবুও দল এবং দলের নেতাকর্মীদের থেকে দূরে থাকিনি, তাদের সঙ্গে নিয়ে ফটিকছড়িতে দলের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম সফল করেছি। দলের কাছে তো সব মেসেজ আছে, হয়তো সে কারণে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
পূর্বদেশ : তাহলে এই যে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং পত্রিকায়, এসব কারা করছে?
সরওয়ার আলমগীর : ছোটখাট যেগুলো ফেসবুক বলেন বা অন্য মাধ্যমে খবর পাওয়া যায়…রিভিউ বলে, এগুলোর ৯০ পার্সেন্ট হলো জামায়াত-শিবির। আমাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি এখন কে? এই গুপ্ত সংগঠনটি। সেই সংগঠনটি আমাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করানোর জন্য বা অনৈক্য দেখানোর জন্য, দলের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য কিছু মানুষকে বিপথগামী করছে। আমি মনে করি, ফটিকছড়িতে জাতীয়তাবাদী দল ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে আছেন।
পূর্বদেশ : নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ঠিক আছে, তাদের কর্মীদের কী অবস্থা?
সরওয়ার আলমগীর : দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কখনোই কোনো বিভাজন থাকে না, তারা সবাই ধানের শীষের জন্য কাজ করবেন। আমি প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় কর্মী-সমর্থকদের ঘরে ঘরে যাচ্ছি, কারও মধ্যে তো কোনো নেতিবাচক মানসিকতা দেখিনি, সবাই ধানের শীষের জয়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ।
পূর্বদেশ : ফটিকছড়ির একটি দুর্নাম ছিল-‘সন্ত্রাসের জনপদ’, এখন কী পরিস্থিতি?
সরওয়ার আলমগীর : ফটিকছড়ি কখনোই সন্ত্রাসের জনপদ ছিল না, এগুলো কথার কথা। এখানকার মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। এটি বিশাল একটি উপজেলা, মাগুরা এবং ফেনী জেলার সমান আয়তন। এই উপজেলা পাহাড়ঘেরা, মনোরম দৃশ্যের এবং পাশে ভারতের সীমান্তও রয়েছে। ভৌগোলিক কারণে এখানে অন্যান্য জায়গার কিছু অপরাধী হয়তো ট্রানজিট নেয়, কিন্তু এখানকার মানুষ যথেষ্ট ভালো। সারা দেশে যেরকম ছোটখাট ঘটনা ঘটে, এখানেও সেই ধরনেরই।
পূর্বদেশ : নির্বাচন নিয়ে কোনো ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
সরওয়ার আলমগীর : বিগত নির্বাচনগুলোর ভোটের হিসাব তো কোনোভাবেই আনা যাবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ গত ১৭ বছর যে ধরনের নির্বাচন করেছে, ফটিকছড়িতে তার আগেও একই ধরনের হয়েছে, ১৯৯৬ সালে হয়েছে; জামালউদ্দিন আহমদের সময়। এখানে আগের রাতে আওয়ামী লীগ ভোট কেটে নিতো, ৭ ইউনিয়নে বিএনপি পেতো দুই হাজার আর ৬০/৭০ হাজার ভোট সব কেটে নিত। এভাবেই তারা এমপি হয়েছে। আগের রাতের ভোটের কথা যে বলি, আমার মনে হয় এটা সবচেয়ে বড় উদাহরণ ফটিকছড়ির ৭ ইউনিয়ন। তবে ইনশাআল্লাহ এবার আমি কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছি না। কারণ, আমি একজন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী, কোথায় কারা কি ডিস্টার্ব করতে পারে সব জানা আছে এবং তৃণমূলের কর্মী হিসেবে ফটিকছড়ির মানুষ আমাকে নির্বাচিত করবেন।
পূর্বদেশ : মনোনয়ন পাওয়ার পর এলাকায় মতবিনিময় সভা, গণসংযোগ তো করেছেন, কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
সরওয়ার আলমগীর : ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি মানুষের ঢল নামছে, মানুষ ভোট দিতে অপেক্ষায় আছে। মা, বোনরা সবাই ভোট কেন্দ্রে যাবেন এবং তারা ধানের শীষকে জয়ী করবেন।
পূর্বদেশ : কেন ও কী কারণে তারা ধানের শীষকে বেছে নেবে?
সরওয়ার আলমগীর : কারণ, বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল। জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি গ্রামীণ পর্যায়ের মানুষের মৌলিক উন্নতিতে এত বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন যে, বেশিরভাগ সময় নিজেই গ্রামে যেতেন, মানুষের সাথে মিশতেন এবং গ্রামীণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। ফটিকছড়ির প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকেন, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। এই যে এ দেশের মানুষের বিদেশযাত্রা, জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আসার এই ব্যাপারটি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল আরেক সোনালী সময়। বিএনপি ক্ষমতায় আসলেই এই দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকতে পারেন, সেজন্য তৃণমূলের মানুষ জিয়া এবং ধানের শীষ বললেই আস্থা রাখেন। এই জিয়া পরিবার আমাকে ধানের শীষ প্রতীক দিয়েছেন সে জন্য মানুষ আমার ওপর আস্থা রাখছেন।
পূর্বদেশ : আপনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে ফটিকছড়ির জন্য কী করবেন, কোন কাজে অগ্রাধিকার দেবেন?
সরওয়ার আলমগীর : আমি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবো। ফটিকছড়িতে ১৮টি চা বাগান, ৪টি রাবার বাগান আছে, নিজস্ব গ্যাস আছে। আমার ভাবনা হলো, ফটিকছড়ির গ্যাস প্রতিটি পরিবার যেন পায়, অর্থাৎ আবাসিক গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। আমরা সেটা করে নেব ইনশাআল্লাহ। প্রতিটি চা বাগান ও রাবার বাগানে গ্যাস এবং এখানে একটি বিশাল শিল্পজোন করতে চাই। কারণ, এখানে সুদক্ষ মানুষ আছে, এখানে একটি শিল্পজোন হলে সেটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভ‚মিকা রাখতে পারবে। আমি অনেক দেশে গিয়েছি, দেখেছি সেখানে পাহাড় ঘেঁষে প্রাকৃতিক পরিবেশ, পরিবেশ ঠিক রেখেই অনেক শিল্পকারখানা আছে। একই ধরনের দৃশ্য আমার ফটিকছড়িতে আছে, আমরা সেটা কাজে লাগাব ইনশাআল্লাহ।
পূর্বদেশ : ফটিকছড়ির বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং আপামর জনসাধারণের প্রতি আপনার আহবান কি?
সরওয়ার আলমগীর : আমার আহবান, এই ভোটকে কেন্দ্র করে আমার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, প্রতিদিন আবেগপ্রবণ বক্তব্য রাখছেন- যে কোনো মূল্যে আমাদের ঐক্য ধরে রাখতে হবে, আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি বলছেন, সামনে একটি বড় দেয়াল, এই দেয়ালটি যদি আমাদের পার হতে হয় ঐক্যের বিকল্প নেই। ঐক্যই আমাদের শক্তি। আমি সবাইকে বলবো, ধানের শীষ আমাদের সবার। আমাদের মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে, অনেকের প্রিয়ভাজন আমি না-ও হতে পারি কিন্তু ধানের শীষ প্রশ্নে তো আমরা এক। আমরা একে অপরের প্রতি সব ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার জন্য আহবান জানাচ্ছি। বিশেষ করে আমাদের নেতাকর্মীদের বলবো-মানুষের মন জয় করতে হবে।
পূর্বদেশ : আপনাকে ধন্যবাদ।
সরওয়ার আলমগীর : আপনাকেও ধন্যবাদ।










