অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতায় কারও পাত্তা নেই, ক্ষুব্ধ সংস্কৃতিকর্মীরা

4

আসাদুজ্জামান রিপন

অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চাঁদার হার বৃদ্ধি করলে সেটা সাধারণ সদস্যদের জানায়নি নির্বাচিত কমিটি। অবহেলার কারণে তারা নিয়মিত বার্ষিক চাঁদা আদায় করেনি। ৬ বছর পর সদস্যপদ নবায়নের জন্য বলা হলেও তা জানেন না অনেক সদস্য। সময়স্বল্পতার কারণে সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেনি ১০৫ জন সাধারণ সদস্য। ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে তারা নির্বাচনে ভোট প্রদান এবং প্রার্থী হতে পারবেন না। খোদ কমিটিরই অনেকে জানেন না এসব বিষয়ে। শিল্পকলা একাডেমির পরিচালনায় এমন স্বেচ্ছাচারিতা আর অনিয়মের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ সদস্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
তারা বলছেন, তাদের অন্ধকারে রেখে সংস্কৃতিমনা সদস্যদের বাদ দিয়ে গঠনতন্ত্র তোয়াক্কা না করে নিজেদের মত করে নির্বাচন করতে চাইছে একটি মহল। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এতদিন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। যথাযথ নিয়ম মেনে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
শিল্পকলার গঠনতন্ত্রে উল্লেখ আছে, টানা দুই বছর বার্ষিক চাঁদা অনাদায়ে সদস্যপদ বিলুপ্তি বলে গণ্য করা হবে। প্রতিবছর বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজনের কথা থাকলেও বিগত ছয় বছরে তা হয়নি। এসব বিতর্কের মধ্যেই শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ ৬ বছর পর বিতর্কের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচন। শিল্পকলা একাডেমির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর সাধারণ সদস্যদের নিয়ে বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করবে। তিনমাস অন্তর নির্বাহী কমিটির মিটিং হবে। সেখানে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ তহবিল হতে ব্যয়ের অর্থ অনুমোদন হবে। তবে জরুরি প্রয়োজনে সভাপতি/আহব্বায়ক আর্থিক অনুমোদন দিতে পারবেন। নির্বাহী কমিটির কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৬ বছরের মধ্যে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভা হয়নি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক বার্ষিক চাঁদার হার বৃদ্ধি, কার্যনির্বাহী কমিটির দুটি সদস্যপদ কমানো এবং গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছে তা জানানো হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, জেলা কালচারাল অফিসারের জানানোর কথা থাকলেও তিনি জানান নি। উল্টো, গত ৪ এপ্রিল বার্ষিক এ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৪ বছরের চাঁদা পরিশোধের জন্য বলা হয়। একই মাসের ২২ তারিখের মধ্যে অফিস চলাকালীন সময়ে চাঁদা পরিশোধ করতে বলা হয়। স্বল্প সময়ের কারণে অনেকে সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেন নি। এখানে কয়েকজন সিন্ডিকেট করে শিল্পকলা একাডেমিকে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের নির্দেশে সবকিছু পরিচালিত হয়। কোন বিষয়ে কমিটির অন্য সদস্যদের মতামত নেওয়া হয় না।
সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকলেও গত কমিটি সাধারণ সদস্যদের নিয়ে কোন সাধারণ সভা আয়োজন করেনি। বার্ষিক বাজেট প্রণয়নসহ আর্থিক হিসাব দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। যা প্রভাব প্রভাব পড়ছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
শিল্পকলা একাডেমির সদস্য রাশেদ হাসান বলেন, ‘যেখানে ২ বছর চাঁদা অনাদায়ে সদস্যপদ বিলুপ্তি হবে সেখানে নির্বাচন আয়োজন প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া অনেক সদস্য না জানার কারণে সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেন নি। একটা অংশকে বাদ দিয়ে সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।’
সদস্য ইমরান ফারুকী বলেন, ‘এখানে অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালের পর থেকে সদস্যদের বার্ষিক ফি নেয় নাই। যেখানে দুই বছর ফি না দিলে সদস্যপদ থাকবে না সেখানে টানা ছয় বছর ফি না দিয়ে সদস্য থাকে কোন ধারায় সেটি বড় প্রশ্ন।’
জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য ও ২০২২ সালে অনুবাদ সাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত আলম খোরশেদ বলেন, ‘সদস্যপদ নবায়নের বিষয়ে আমি জানি না। আমাকে জানানো হয়নি। মেইলে এসেছে কিনা সেটা জানি না, দেখা হয়নি।’
সদ্যবিলুপ্ত নির্বাহী কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক হাসান জাহাঙ্গীর বলেন, ‘শিল্পকলায় যা হয়েছে সবকিছু নিয়মের পরিপন্থি। আমাদের কাজ করার কোন সুযোগ দেয় নি। কোন সিদ্বান্তের বিষয়ে আমরা জানতাম না, কোন পরামর্শ নেওয়া হয়নি। কমিটির মেয়াদে ২ থেকে ৩ বার নির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে। অথচ গঠনতন্ত্রে বলা আছে, তিন মাস অন্তর নির্বাহী কমিটির সভা আয়োজন করার। তাছাড়া সদস্যপদ নবায়নের যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কালচারাল অফিসার বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন নির্বাহী কমিটির নির্বাচন হয়নি। জেলা শিল্পকলা একাডেমির এডহক কমিটির সভার সিদ্বান্তক্রমে ও সভাপতির পরামর্শক্রমে সদস্যপদ নবায়নের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। সকল সদস্যকে এসএমএস দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলার ফেসবুক গ্রুপেও জানানো হয়েছে। এখানে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘনের বিষয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলতে পারে। আমি সরকারি কর্মচারী। সরকারি কর্মচারী প্রবিধান মেনে কাজ করি।’
নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং আর্থিক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গঠনতন্ত্রের কোথাও লেখা নেই নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে হবে। সাধারণ তহবিলের খরচের বিষয়ে সরকারের অডিট বিভাগ আছে, তারা অডিট করছে। এটা কোন ক্লাব বা ইউনিয়ন নয় যে আয় ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের দিতে হবে। সরাসরি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কাছে দায়বদ্ধ।’