‘অতি উচ্চ সংকটাপন্ন’ পটিয়াতে ওয়াসার সংযোগে আগ্রহ নেই

5

এম এ হোসাইন

পটিয়া উপজেলাকে সরকারিভাবে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা পেয়েছে। পটিয়ায় ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে, টিউবওয়েল শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির জন্য হাহাকার বাড়ছে। এমন বাস্তবতার মধ্যেও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সংযোগ নিতে স্থানীয়দের আগ্রহ নেই বললেই চলে। ওয়াসা বলছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য নেওয়া ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের পানি পেতে বেশি আবেদন আসছে মইজ্জারটেক এলাকা থেকে, পটিয়া থেকে তেমন আবেদন আসছে না।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, সরকার পটিয়াকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমরা চাইলে এক মাসে বিশ হাজার লাইনের সংযোগ দিতে পারি, কিন্তু মানুষ আবেদন দিচ্ছে না। পটিয়া সংকটাপন্ন এলাকা হলেও এখান থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তুলনায় মইজ্জারটেক এলাকা থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের কাছে নির্দিষ্ট করে কোন এলাকায় কতটি সংযোগ হয়েছে সেটা নেই। তবে আনুপাতিক হারে পটিয়াতে কম সংযোগ হচ্ছে। সেখানে আরো কয়েকগুন বেশি হওয়ার কথা ছিল।
সরকার গত ২৫ আগস্ট প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পটিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন (১০৪ মৌজা) ও ১টি পৌরসভা (৮ মৌজা)-এর মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন (৭টি মৌজা) এবং পৌরসভার ৫টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চরকানাই, হুলাইন, হাবিলাস দ্বীপ, পাচুরিয়া ও আশপাশের এলাকাগুলোতে পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে তিন থেকে সাত ফুট পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। প্রায় ৩৫০টিরও বেশি টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে, ফলে কৃষিকাজ, গৃহস্থালী ব্যবহার ও জনস্বাস্থ্যে দেখা দিয়েছে মারাত্মক সমস্যা।
বাংলাদেশ পানি আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী জলাধার ও পানি স্তর সংরক্ষণ এবং সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার জন্য অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম পানি সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। পটিয়া পৌরসভার ৫টি মৌজা অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এবং ৩টি মৌজা উচ্চ পানি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ৭টি মৌজা অতি উচ্চ, ৯টি ইউনিয়নের ২৭টি মৌজা উচ্চ এবং ৮টি ইউনিয়নের ৩০টি মৌজা মধ্যম সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার আলম চৌধুরী বলেন, পটিয়ায় এখন পানি পাওয়া মানে যুদ্ধ জেতার মতো বিষয়। টিউবওয়েল থেকে অল্প অল্প পানি আসে। শীতকাল আসলে তো পানি উঠেই না। ওয়াসার লাইন থাকলে এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাওয়া যেত। কিন্তু সংযোগ নিতে গেলে কাগজপত্র আর খরচের ঝামেলায় অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তাছাড়া গ্রামে শুধু খাওয়ার পানির জন্যই ‘যুদ্ধ’। আর ব্যবহারের জন্য পুকুরের পানি পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় পানি তোলার যন্ত্র বসানোর পরও পানির দেখা পাওয়া যায় না। আবার কিছু এলাকায় পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবহার উপযোগী নয়। এ অবস্থায় ওয়াসার পাইপলাইনে সংযোগ পাওয়া হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে তারা মনে করছেন। কিন্তু সংযোগ নিতে আবেদন প্রক্রিয়া জটিল এবং খরচ বেশি হওয়ায় অনেকেই পিছিয়ে আছেন।
ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, পটিয়াতে আমরা শুধু পৌরসভাতে লাইন দিচ্ছি। আমরা চাহিদা অনুযায়ী লাইন দিতে প্রস্তুত। প্রকল্পের আওতায় পটিয়ায় সহজ শর্তে সংযোগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে আবেদন না থাকায় সে অনুপাতে সংযোগ দেয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত দশ বছরে পটিয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ৬০ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। বর্ষা মৌসুমেও টিউবওয়েল থেকে পর্যাপ্ত পানি তোলা যাচ্ছে না। অনেক পরিবার এখন নালা, খাল কিংবা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষিকাজে উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। পটিয়ার চার লাখের বেশি মানুষের জনসংখ্যার এলাকায় ভ‚-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ৩-৭ ফুট নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে হাবিলাস দ্বীপ, চরকানাই, হুলাইন ও পাচুরিয়া ইউনিয়নের অনেক টিউবওয়েল কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি উভয়ে বিপর্যে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রথমেই প্রয়োজন জনসচেতনতা বাড়ানো। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে ওয়াসার সঙ্গে সমন্বয় করে সংযোগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ টিউবওয়েল স্থাপন বন্ধ, পানির অপচয় রোধ ও বিকল্প উৎস তৈরিতে স্থানীয় প্রশাসনের ভ‚মিকা বাড়ানো দরকার।