অগ্রহায়ণ মানে শীতের স্বাগত মাস। এসময় মিষ্টি রোধ আর হালকা বাতাসে প্রকৃতি সাজে অনন্য শোভায়। শীতের আগমনি ধ্বনিতে মন যতই রোমাঞ্চিত হোক, বিপরীতে কিছু দুঃসংবাদ অনেকের জীবনতে উলটপালট করে দেই। দুঃসংবাদগুলোর একটি হচ্ছে, আগুন লাগার প্রকোপ। শুষ্ক মৌসুম যতই ঘনিয়ে আসবে ততই বিভিন্ন ভবনে, দোকানে, শিল্প-কারখানায় আগুন লাগার এক তান্ডব শুরু হয়। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার মহাখালীস্থ কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচঘন্টা ১৯টি ইউনিট আপ্রাণ চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনার কিছুদিন আগে মিরপুরে কেমিক্যাল কারখানা, হজরত শাহ জালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কার্গো টার্মিনালে, চট্টগ্রামের বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোডে সুউচ্চ ভবনে এবং দেশের প্রধান শিল্প জোন কেইপিজেডের একটি কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ বাড়ছে। হঠাৎ করে এক মাসের মাথায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে এ জাতীয় আগুন নিয়ে নানাজনে বিভিন্ন কারণ খুঁজতে পারেন। তবে প্রকৃত কারণ হচ্ছে, অসতর্কভাবে আগুনের ব্যবহার, অথবা শর্ট সার্কিট অথবা গ্যাসের ব্য্হারে অসতর্কতা। কোন কোন জায়গায় বিড়ি-সিগারেটের আগুন থেকেও ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। এক্ষেত্রে এসময়ে আমাদের প্রধান কাজ হতে হবে সচেতন হওয়া। তবে অনেকে মনে করেন, আগুনের প্রভাব গ্রীষ্মকালে বেশি হয়। কারণ গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে প্রকৃতি থাকে উত্তপ্ত। ফলে এই সময়টা দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। কোথাও স্বল্প পরিসরে আবারও কোথাও বা ভয়াবহ।
আগুন যখনই যে মৌসুমেই লাগুক, বাস্তবতা হচ্ছে, জীবন-যাপনে কোন কাজেই সচেতনতার বিকল্প নেই। জেনে বুঝে আমরা যদি অচেতন থাকি তাহলে আমাদের কোন কাজেই সফলতা আসবে না। সচেতনতা বা সতর্কতাই সকল নিরাপত্তা দিতে পারে। ক্ষয়ক্ষতি যেমনই হোক না কেন আগুণ কিন্তু সবসময় মারাত্বক। কারণ ছোট ছোট আগুনে মানুষ না পুড়লে পুড়ছে মানুষের স্বপ্ন। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের সব বিভাগ থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আগুনজনিত দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়-ক্ষতি বেশি। পরিসংখ্যানসূত্রে, ২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এর ২০৮৮টি ঢাকায়, চট্টগ্রামে ২৮৫ ও রাজশাহীতে ১১৬টি এসব ঘটনায় শুধুমাত্র ঢাকায় প্রাণ হারায় ১২১ জন। আর এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মতো। আর ২০১৪ সালে ১৫২টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ৮৫ কোটি, ২০১৫ সালে ২১৩টি দুর্ঘটনায় প্রায় ২৮ কোটি ও ২০১৬ সালে ১৯০টি অগ্নিদুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউএসএসএবি) ২০১৮ সালের ৩১ মার্চে দেওয়া তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে ৬ বছরে অগ্নিকান্ড হয়েছে ৮৮ হাজার। এ অগ্নিকান্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যেহেতু পোশাক কারখানাতেই হাজার হাজার মানুষ একসাথে কাজ করে তাই সেখানে আগুনে প্রাণহানির আশঙ্কা সবচেযে বেশি। অগ্নিকান্ড এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর কারণ খুঁজলে উত্তর হলো ঢাকা ও চট্টগ্রামে অল্প জায়গায় বেশি মানুষ বসবাস করে। অনেক অপরিকল্পিত ও অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে। নতুন নতুন ইলেকট্রিক গ্যাজেট, ল্যাপটপ, মোবাইল চার্জারসহ অন্যান্য দাহ্য পদার্থের প্রাপ্যতা বেশি। তাই অগ্নিকান্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।
আমাদের জানা দরকার, অগ্নিকান্ডের অন্যতম উপকরণ হলো অত্যধিক তাপ, জ্বালানী ও অক্সিজেন। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে কোন উল্লেখযোগ্য প্রচারণা আছে বলে আমাদের মনে হয় না। আমাদের দেশে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল বিশেষ করে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যে ক্ষেত্রে আগুন নেভানো, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা দরকার, সেসব ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো প্রস্তুতি নিতে হবে। এছাড়া জনগণের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে সরকারকে ফায়ার সার্ভিস বিভাগকে আরো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ ও বিভিন্ন স্থানে শিল্প-কারখানা স্থাপনসহ দাহ্য পদার্থ জাতীয় পণ্য গুদামজাতকরণ সংক্রান্ত সরকারের যে বিধি ও আইন রয়েছে তা যথাযথ অনুসরণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তদারকি প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অগ্নিকান্ড শুধু মানুষ কিংবা কোন সম্পদের ক্ষতির দিকটা প্রধান বিবেচনার বিষয় নয়, অগ্নিকান্ড জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় বড় ক্ষত সৃষ্টি করে। যেখানে বাকি জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে অগ্নিকান্ড প্রতিরোধে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।











